বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর কুমিল্লা রাজনীতি এখন অভ্যন্তরীণ সংকটে টালমাটাল। দলের কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দলের একাংশের ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়েছে মেঘনা ও হোমনায়। একের পর এক ঝাড়ু মিছিল, কুশপুত্তলিকা দাহ ও গণবিক্ষোভে দুই উপজেলা জুড়ে চলছে উত্তাপ—দলীয় নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে তাকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’, ‘দলবিভাজক’ ও ‘ভাড়াটিয়া নেতা’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
‘ভুয়া কমিটি’ প্রকাশে ক্ষোভ, মেঘনায় বিক্ষোভে উত্তাল নেতা-কর্মীরা
গত ২ নভেম্বর বিকেলে মেঘনা উপজেলা বাসস্ট্যান্ড থেকে শুরু হয় বিএনপির এক বিক্ষোভ মিছিল। উপজেলা সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে উপজেলা চত্বরে সমাবেশে রূপ নেয় এ কর্মসূচি।
নেতৃত্ব দেন উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক রমিজ উদ্দিন লন্ডনী, যুগ্ম আহ্বায়ক মিজানুর রহমান, প্রফেসর শহিদুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান, ও আতাউর রহমান ভূঁইয়া।
বক্তারা অভিযোগ করেন—সেলিম ভূঁইয়া গত ৩১ অক্টোবর রাতে কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আক্তারুজ্জামান সরকারের স্বাক্ষর ছাড়াই সদস্য সচিব এ.এফ.এম. তারেক মুন্সির নাম ব্যবহার করে ১৫৩ সদস্যের একটি ভুয়া কমিটি প্রকাশ করেছেন।
এছাড়া দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তিনি মেঘনা ও হোমনা উপজেলা বিএনপিকে বিভক্ত করে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য ও বালু ব্যবসা পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ ওঠে।
সমাবেশ শেষে সেলিম ভূঁইয়ার কুশপুত্তলিকা দাহ ও গণজুতা নিক্ষেপ কর্মসূচি পালিত হয়।
হোমনায় হাজারো মানুষের ঝাড়ু মিছিল: ‘ভাড়াটিয়া নেতা’ অবাঞ্ছিত ঘোষণা
৬ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) বিকেলে হোমনা চৌরাস্তায় অনুষ্ঠিত হয় আরও বৃহত্তর ঝাড়ু মিছিল। নেতৃত্ব দেন মাথাভাঙা ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা, যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাইনুদ্দিন, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক গোলাম মোস্তফা, ও যুবদল নেতা আমানুল্লাহ আমান।
সহস্রাধিক নারী–পুরুষ এতে অংশ নেন। বক্তারা অভিযোগ করেন—সেলিম ভূঁইয়া দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে হোমনা উপজেলা বিএনপিকে দুইভাগে বিভক্ত করে কোটি টাকার পদবাণিজ্য করেছেন।
তাকে ‘দুর্নীতিবাজ’ আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে পদ থেকে অপসারণ এবং ‘হোমনায় অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করা হয়।
সেলিম ভূঁইয়ার অবস্থান ও পর্দার আড়ালের লড়াই
অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির তৃণমূল রাজনীতিতে প্রভাবশালী। স্থানীয়ভাবে তাকে কেউ কেউ বলেন ‘মেঘনার সূর্যসন্তান’। তবে কুমিল্লা–২ আসনের পুনর্বিন্যাস এবং মনোনয়ন ইস্যু ঘিরে তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দলীয় সূত্র জানায়—দাউদকান্দির সঙ্গে মেঘনাকে একীভূত করার পদক্ষেপকে অনেকেই ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছেন, যা ভূঁইয়ার প্রভাব খর্ব করার একটি প্রচেষ্টা।
সব অভিযোগ সত্ত্বেও তিনি ৫ নভেম্বর হোমনায় জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের প্রস্তুতি সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন।
কেন্দ্র নীরব, তৃণমূল জ্বলে উঠেছে
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এখনো এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে প্রতিবাদকারীরা জানাচ্ছেন, তাঁরা ইতিমধ্যে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে লিখিত অভিযোগ পাঠিয়েছেন—সেলিম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে তদন্ত ও পদচ্যুতি দাবি করে।
কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির একাধিক নেতা বলেন,
“এই দ্বন্দ্ব দ্রুত না থামলে সংগঠন ভেঙে পড়বে। দলীয় ঐক্য রক্ষায় কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।”
মন্তব্য করুন