সত্যজিৎ দাস
বাংলাদেশ পুলিশের কাঠামোতে সাব-ইনস্পেক্টর (এসআই) পদটি এমন এক জায়গা, যার ওপর নির্ভর করে থানার দৈনন্দিন কাজ থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের জরুরি অভিযান পর্যন্ত অসংখ্য কার্যক্রম। দায়িত্বের বিস্তৃতি যতটা বড়,তাদের প্রস্তুতি,সরঞ্জাম ও সময়-সেসব ততটা সচ্ছল নয়।
এ কারণেই একজন এসআইের দিনকে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন; সময় থাকে না,কিন্তু কাজ থাকে থেমে না থাকা নদীর মতো।
বাংলাদেশ পুলিশের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, একেক থানায় বছরে গড়ে ৭০০-১২০০ মামলা রেজিস্টার হয়। এর মধ্যে একটি মাঝারি মানের থানায় প্রত্যেক এসআইয়ের ঘাড়ে অনায়াসে ২৫-৪০টি চলমান তদন্ত থাকে। যেমন; জিডি ও এফআইআর যাচাই,ঘটনাস্থল পরিদর্শন,সাক্ষী জোগাড়,সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার,চার্জশিট তৈরি।
অধিকাংশ তদন্তেই প্রযুক্তিভিত্তিক সহায়তার স্বল্পতা এবং সাক্ষীর অনুপস্থিতি বিচারের গতি কমিয়ে দেয়, যার দায়ও এসে পড়ে এসআইয়ের ওপর।
এসআইদের দায়িত্বরত এলাকায় জনসাধারণের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য মাঠে এসআইরাই নেতৃত্ব দেন। রাতভর টহল,মাদকবিরোধী অভিযান,ধর্মীয় নানা অনুষ্ঠানে ও রাজনৈতিক কর্মসূচির নিরাপত্তা,
বিশেষ কম্বিং অপারেশন,বর্ডারিং এলাকায় চোরাচালানবিরোধী টাস্ক।
ঢাকা মহানগরীতে প্রতিদিন গড়ে ৬,০০০-৭,০০০ পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন,এদের বড় একটি অংশ নেতৃত্ব দেন এসআইরা।
প্রতিদিন আদালতে হাজিরা,মামলার অগ্রগতি রিপোর্ট,রিমান্ড শুনানি-সবকিছুই একজন এসআইয়ের অতিরিক্ত কর্মদায়িত্ব।
মীরপুর, মতিঝিল,বন্দর,পর্যটন নগরী এলাকার মতো চাপযুক্ত থানায় দিনে ৩-৮টি আদালত-সম্পর্কিত কার্যক্রম সামলাতে হয়।
পুলিশের অভ্যন্তরীণ নীতি অনুযায়ী দৈনিক কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টা ধরা হলেও মাঠের বাস্তবতা তার উল্টো। অনেক দিন ১৪-১৬ ঘণ্টা টানা দায়িত্ব পালন
ঢাকা,চট্টগ্রাম,খুলনা সহ সিলেটের পর্যটন ভিত্তিক শহরে মতো শহরে উৎসব বা রাজনৈতিক সময়সীমায় ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত ডিউটির নজির। ছুটি প্রায়ই বাতিল হয়,রাতজাগা টহলের পর আবার সকালে আদালত হাজিরা।
এমন কর্মঘণ্টা দীর্ঘমেয়াদে তাদের মানসিক ও শারীরিক চাপ বাড়ায়,যা নিয়ে আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে আলোচনা খুব কমই হয়।
বেতন ও সুবিধা: দায়িত্বের তুলনায় সীমিত প্রতিদান।
২০২৫ সালের বেতন কাঠামো অনুযায়ী,এসআই পদটি ১০ম গ্রেডে থাকে।
মূল বেতন: ১৬,০০০-৩৮,৬৪০।
মোট আনুমানিক বেতন (ভাতা-সহ): ৩২,০০০- ৪৮,০০০।
ঝুঁকি ভাতা: সীমিত ও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য
ইউনিফর্ম/অস্ত্র ভাতা: খুবই কম।
বাসস্থান সুবিধা: অধিকাংশ থানায় কোয়ার্টার পর্যাপ্ত নয়।
যেখানে একজন এসআইকে একই দিনে কখনও অপরাধ তদন্ত,কখনও সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার,আবার কখনও জনসমাবেশের নিরাপত্তা সামলাতে হয়- সেখানে এই বেতন কাঠামো অনেকের কাছে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়।
বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ স্বভাবতই ঝুঁকিপূর্ণ। পুলিশ সদরদফতরের আংশিক তথ্য অনুসারে:গত এক দশকে দায়িত্ব পালনের সময় শতাধিক পুলিশ সদস্য নিহত,হাজারো সদস্য আহত। ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে যানবাহন সহ সরঞ্জামের ঘাটতির বিষয়টি তদন্তের রিপোর্টেও উঠে আসে,যা বিভিন্ন সময় নিউজ পোর্টাল,দৈনিক পত্রিকার প্রতিবেদনে লক্ষ্য করা যায়।
এসআইদের প্রধান ঝুঁকি:
১) মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট।
২) রাতের টহলে সশস্ত্র অপরাধী।
৩) সংঘর্ষ পরিস্থিতিতে গুলিবিদ্ধ বা আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার ঝুঁকি।
৪) গ্রেপ্তারের সময় হামলার শিকার হওয়া।
৫) হাই-প্রোফাইল বা রাজনৈতিক মামলায় ব্যক্তিগত হুমকি।
এসব ঝুঁকি পরিবারেও তারা অনেক সময় জানান না—মানসিক চাপের বড় অংশ তাই জমে থাকে চাপা অবস্থায়।
একেক থানায় ৬-৮ জন এসআই দিয়ে প্রায় হাজারো আবেদন,অভিযোগ,মামলা সামলাতে হয়।
ফলে প্রশাসনিক চাপ অস্বাভাবিক মাত্রায়।
তদন্তে তথ্য প্রযুক্তির ঘাটতি,ফরেনসিক সহায়তার সীমাবদ্ধতা,অপর্যাপ্ত সিসিটিভি ফুটেজ,যানবাহনের স্বল্পতা,অস্ত্র আপডেটেড হয়ন,শীতকালীন পোশাক বা বৃষ্টির মৌসুমে রেনকোটের মান এতোটা উন্নত নয়,যে একজন এসআই পরিধান করে কমফোর্টেবল হবে!
তদন্তের ক্ষেত্রে সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের হস্তক্ষেপ,এটি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এসআইদের অনেকেই বলেন,“আইন অনুযায়ী কাজ করতে চাই,কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় অন্য পথ বেছে নিতে বাধ্য করে।”
সমালোচনা আছে,এটিও সত্য। কিন্তু একজন এসআই যে অপারেশন পরিচালনা করেন,যে রাত জেগে টহল দেন,যে আদালতে রিপোর্ট দেন,যে আবার অভিযোগকারীকে সেবা দেন-এসবের পিছনে আছে এক বিশাল চাপ,পরিশ্রম এবং ঝুঁকি।
বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত হলে জনমনে আস্থার জায়গাটিও বাড়বে,তার জন্য প্রয়োজন গবেষণাভিত্তিক নীতি পরিবর্তন এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বাস্তবতা বোঝা।
কারণ নিরাপত্তা তখনই কার্যকর হয়,যখন নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা মানুষগুলোর জীবনও নিরাপদ ও মানবিক হয়।