মোঃ আবুসুফিয়ান তালুকদার
আজ ১৪ ডিসেম্বর—সিরাজগঞ্জ হানাদারমুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পাক হানাদার বাহিনী সিরাজগঞ্জ শহর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর বিজয়ের প্রতীক হিসেবে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা।
ডিসেম্বরের ১০ তারিখ থেকেই সিরাজগঞ্জে অবস্থানরত পাক হানাদার বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়তে শুরু করে। একই সঙ্গে তাদের সহযোগী তথাকথিত শান্তি কমিটি, রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর তৎপরতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। ১৩ ডিসেম্বর রাতে পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে, যখন মুক্তিযোদ্ধারা পাক বাহিনীকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলেন।
স্থল ও নৌপথ মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে এলেও একমাত্র রেলপথ তখনও পাক বাহিনীর দখলে ছিল। এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা সিরাজগঞ্জ রেলওয়ে ঘাট, যমুনা নদীর তীরবর্তী এলাকা, কাজিপুর মোড়সহ বিভিন্ন কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান নেন।
পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাক হানাদার বাহিনী শেষ পর্যন্ত ট্রেনযোগে ঈশ্বরদীর দিকে পালিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের পাঠানো রেকি দল বিষয়টি নিশ্চিত করলে পুরো শহরজুড়ে শুরু হয় বিজয়োল্লাস। সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে মুক্তিযোদ্ধাদের অভিনন্দন জানায়।
পরে মুক্তিযোদ্ধারা ফাঁকা গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের যুদ্ধবিধ্বস্ত শহীদ মিনারের পাদদেশে সমবেত হন। সেখানে দাঁড়িয়ে তারা স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের দৃঢ় শপথ গ্রহণ করেন।
পাক বাহিনীর পলায়নের সঙ্গে সঙ্গে সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি, কামারখন্দ, রায়গঞ্জ, চৌহালী, উল্লাপাড়া ও শাহজাদপুর থানা এলাকাসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল শত্রুমুক্ত হয়। ১৪ ডিসেম্বর ভোরে মুক্তিযোদ্ধারা সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার ওয়াপদা অফিসে অবস্থিত পাক বাহিনীর প্রধান ক্যাম্প দখলে নেন।
একই দিনে কওমী জুটমিল, মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয়সহ জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনায় স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।
সিরাজগঞ্জ মুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে উত্তরাঞ্চলে পাক হানাদার বাহিনীর পতন আরও ত্বরান্বিত হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের অদম্য সাহস, কৌশলী নেতৃত্ব এবং সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সহযোগিতাই এই ঐতিহাসিক বিজয়ের মূল ভিত্তি হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মন্তব্য করুন