মেহেদী হাসান হাবিব
জামালপুর: কনকনে শীতের সকাল হোক কিংবা তপ্ত দুপুর, জামালপুরের যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে মাটির সোঁদা গন্ধ আর মশলার সুবাসে ম-ম করে চারপাশ। আর এই সুবাসের মূলে রয়েছে জেলাটির শত বছরের ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘মিল্লি’ বা ‘পিঠালি’। তবে আধুনিক চিনা মাটির বাসন বা প্লাস্টিকের প্লেটের ভিড়ে আজও কলাপাতা বা মাটির সানকিতে পরিবেশিত মিল্লি ভাতের রাজকীয় স্বাদ যেন জামালপুরবাসীর আত্মপরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রান্নার এই ঐতিহ্য নিয়ে প্রখ্যাত রন্ধনশিল্পী জেমস বিয়ার্ড বলেছিলেন:
"খাদ্যই আমাদের একমাত্র সাধারণ ভিত্তি, যা আমাদের সর্বজনীন অভিজ্ঞতা প্রদান করে।" মিল্লি ভাত ঠিক তেমনি জামালপুরবাসীর সেই সর্বজনীন অভিজ্ঞতার নাম।
মিল্লি বা পিঠালির উৎপত্তির ইতিহাস বেশ প্রাচীন। স্থানীয় গবেষক ও প্রবীণদের মতে, ‘মিল্লি’ শব্দটি এসেছে মূলত আরবি শব্দ ‘মিল্লাত’ বা ফারসি ‘মিলাদ’ থেকে। অতীতে এই জনপদে মিলাদ মাহফিল বা ধর্মীয় সমাবেশ শেষে তবারক হিসেবে বড় ডেকচিতে করে এই বিশেষ মাংসের ঝোল ও ভাত খাওয়ানো হতো। ‘মিলাদ’ অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হতো বলেই লোকমুখে এর নাম হয়ে যায় ‘মিল্লি’।
অন্যদিকে, রান্নার বিশেষ প্রক্রিয়া থেকে এর দ্বিতীয় নামটির উৎপত্তি। মাংসের ঝোল ঘন করতে চালের গুঁড়া বা ‘পিঠালি’ ব্যবহার করা হয় বলে অনেকে একে ‘পিঠালি ভাত’ হিসেবেও চিনে থাকেন।
মিল্লি ভাতের আসল আভিজাত্য ফুটে ওঠে এর পরিবেশন শৈলীতে। কলাপাতার নিজস্ব ঘ্রাণ গরম মিল্লি ভাতের সাথে মিশে এক অদ্ভুত স্বাদের সৃষ্টি করে। স্থানীয়দের মতে, "কলাপাতায় মিল্লি খাওয়া শুধু নিয়ম নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির শিকড়।"
এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত ব্রিটিশ লেখক ও ভ্রমণকারী ভার্জিনিয়া উলফ-এর একটি কথা মনে পড়ে যায়:
"ভালোভাবে না খেলে মানুষ ভালোভাবে চিন্তা করতে পারে না, ভালোবাসতে পারে না, এমনকি ঠিকমতো ঘুমাতেও পারে না।" জামালপুরবাসীর জন্য সেই 'ভালোভাবে খাওয়া' মানেই হলো কলাপাতা বিছিয়ে পরম তৃপ্তিতে মিল্লি ভাত খাওয়া।
মিল্লি তৈরির পদ্ধতি সাধারণ কারি থেকে ভিন্ন। এতে মাংস, প্রচুর মশলা, চালের গুঁড়ার পিঠালি এবং সবশেষে বিশেষ ‘বাগার’ দেওয়া হয়।
বিশ্বখ্যাত শেফ অ্যান্থনি বোর্ডেন বলেছিলেন:
"আমাদের খাবারের মাধ্যমেই আমরা আমাদের ইতিহাস আর পরিচয়কে অন্যের কাছে তুলে ধরি।" মিল্লির এই অনন্য রন্ধনশৈলীই যেন বাইরের মানুষের কাছে জামালপুরের আসল পরিচয় তুলে ধরে।
জামালপুর, ইসলামপুর ও মেলান্দহ অঞ্চলের মানুষের কাছে মিল্লি কেবল একটি খাবার নয়, এটি সামাজিক সংহতির প্রতীক। বিয়ে বা যেকোনো অনুষ্ঠানে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই একই সারিতে বসে এই খাবার গ্রহণ করেন। এটি যেন বিভেদ ভুলে এক হওয়ার এক সুস্বাদু উপলক্ষ।
শান্তিতে নোবেল জয়ী ডেসমন্ড টুটু একবার বলেছিলেন:
"খাবার ভাগ করে খাওয়ার চেয়ে বড় সামাজিক বন্ধন আর কিছু হতে পারে না।" মিল্লি ভাতও ঠিক সেই কাজটিই করে যাচ্ছে শত বছর ধরে—মানুষে মানুষে মিল ঘটানো।
বর্তমানে জামালপুরের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পিঠালি ঘর গড়ে উঠছে। তবে যমুনার পলিধোয়া মাটির ওপর বসে কলাপাতায় মিল্লি খাওয়ার যে তৃপ্তি, তা কেবল জামালপুরেই সম্ভব।
মন্তব্য করুন