জনতার খবর রিপোর্টার
প্রকাশঃ 6-ডিসেম্বর-2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

নওগাঁ, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভূগর্ভস্থ পানি সংকটের ভয়াবহতা

আবু সায়েম 

বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সংকটের ভয়াবহতা: ৪ হাজার ৯১১ মৌজায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা
বরেন্দ্র অঞ্চলের তিন জেলা—রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ—জুড়ে দীর্ঘদিনের পানিসঙ্কট এবার আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি নীতিতে প্রতিফলিত হলো। সরকার সম্প্রতি ৪ হাজার ৯১১টি মৌজাকে আগামী ১০ বছরের জন্য পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করেছে। প্রকাশিত গেজেটে জানানো হয়েছে, এসব এলাকায় খাবার পানি ছাড়া অন্য কোনো কারণে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।
এই সিদ্ধান্ত হাতে পাওয়ার পর বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)–এর গভীর নলকূপনির্ভর সেচ কার্যক্রম বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থায় সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানিই ছিল প্রধান ভরসা।
দীর্ঘ দিনের আন্দোলন-সচেতনতার ফসল এই সিদ্ধান্ত
এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির সংকট নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন আলোচনা, মতবিনিময় সভা, গবেষণা ও প্রচারণা চালিয়ে আসছিল বরেন্দ্র ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (বিডিও)। কৃষক, ডীপ অপারেটর, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সমাজসেবকসহ সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে তারা তুলে ধরেছিল ভয়াবহ ভূগর্ভস্থ পানির স্তরপতনের বাস্তবতা।
এ অঞ্চলে পানির সংকট একটি পরিবেশগত বিপর্যয়ের দিকে এগোচ্ছে—এই সতর্কবার্তা বারবার উচ্চারিত হলেও ব্যাপক ক্ষেত্রজুড়ে পানির ব্যবহার কমানোর প্রয়োজনীয়তা অনুধাবনে দেরি হয়েছে। তবে ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলেই এবার পাওয়া গেল গেজেট আকারে আইনি নির্দেশনা।
কোথায় কত মাত্রায় পানি সংকট?
সরকারি গেজেটে তিন মাত্রায় সংকট নির্ধারণ করা হয়েছে-
অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন, উচ্চ পানি সংকটাপন্ন, এবং মধ্যম পানি সংকটাপন্ন।
অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা (৪৭ ইউনিয়ন)
বরেন্দ্র অঞ্চলের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো পড়েছে রাজশাহীর গোদাগাড়ী, মোহনপুর, পবা ও তানোর,
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর, গোমস্তাপুর ও নাচোল,
এবং নওগাঁর নিয়ামতপুর, পত্নীতলা, পোরশা ও সাপাহার উপজেলায়।
উদাহরণস্বরূপ—
রাজশাহী–গোদাগাড়ী: দেওপাড়া, পাকড়ি, রিশিকুল
নওগাঁ–নিয়ামতপুর: ভাবিচা, হাজিনগর, রসুলপুর, শ্রীমন্তপুর
চাঁপাইনবাবগঞ্জ–গোমস্তাপুর: রহনপুর, আলিনগর, চৌডালা
সাপাহার: শিরন্টী, তিলনা, আইহাই
এই এলাকাগুলোতে বহু বছর ধরে পানির স্তর প্রতি বছর গড়ে ৩–৬ ফুট করে নিচে নেমে যাচ্ছে বলে পানি উন্নয়ন গবেষকরা জানাচ্ছেন।
উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা (৪০ ইউনিয়ন)
তুলনামূলক কম হলেও এখনও অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে—
রাজশাহীর বাঘা, চারঘাট, দুর্গাপুর, বাগমারা,
নওগাঁর আত্রাই, মহাদেবপুর, মান্দা, রানীনগর,
এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর, শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর।
যেসব ইউনিয়নে সংকট উচ্চ মাত্রায়—
বাঘা–গড়গড়ি, পাকুড়িয়া
মান্দা–গণেশপুর, মৈনম, তেঁতুলিয়া
শিবগঞ্জ–নয়ালাভাঙ্গা, শ্যামপুর, উজিরপুর
এ এলাকাগুলোতে কৃষি সেচের কারণে পানির স্তর হঠাৎ কমে যাওয়ার প্রবণতা বেশি।
মধ্যম পানি সংকটাপন্ন এলাকা (৬৬ ইউনিয়ন)
সংকট তুলনামূলক কম হলেও সব এলাকায় পানির স্তর দ্রুত নিচে নামছে।
এ তালিকায় রয়েছে—
রাজশাহীর বাঘা, বাগমারা, চারঘাট, দুর্গাপুর, পুঠিয়া,
নওগাঁর আত্রাই, ধামইরহাট, মান্দা, নওগাঁ সদর, নিয়ামতপুর,
এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট, শিবগঞ্জ, সদর।
যেমন—
নওগাঁ সদর–দুবলহাটি, হাঁসাইগাড়ি, তিলকপুর
পুঠিয়া–বানেশ্বর, ভালুকগাছি, শিলমাড়িয়া
ভোলাহাট–গোহালবাড়ী, জামবাড়িয়া
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—এই সব ইউনিয়ন যদি এখনই সুশাসনভিত্তিক পানির ব্যবহার শুরু না করে, তবে অতি অল্প সময়েই তারা ‘উচ্চ সংকট’ পর্যায়ে চলে যাবে।
গেজেটে কী নিষেধাজ্ঞা আছে?
সরকারি নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে—
1. খাবার পানি ব্যতীত অন্য কোনো কারণে নতুন নলকূপ স্থাপন করা যাবে না।
2. বিদ্যমান নলকূপ থেকেও সেচ বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিষিদ্ধ।
3. পানি আইন ২০১৩-এর ধারা ৩ ও ১৮ অনুযায়ী পানির ব্যবহার হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে—
প্রথমত: খাদ্য পানীয় জল
দ্বিতীয়ত: গৃহস্থালি ব্যবহার
সর্বশেষ: কৃষি বা শিল্প
BMDA–র চাষাবাদ কি বিপর্যয়ের মুখে?
বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষি সেচের ৮০%–এর বেশি নির্ভরশীল BMDA–র গভীর নলকূপে।
কিন্তু গেজেটে স্পষ্ট বলা থাকায় এই সেচ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেলে—
বোরো ধানের উৎপাদন গুরুতরভাবে ব্যাহত হবে
ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা আরও বেড়ে যেতে পারে
আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমে আসবে
কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা বলছেন—“জল না পেলে ধান কীভাবে হবে?”
বিশেষজ্ঞদের মত
পরিবেশবিদদের মতে—
> “এই সিদ্ধান্ত দেরিতে হলেও অত্যন্ত সময়োপযোগী। ভূগর্ভস্থ জলাধার ধ্বংস হয়ে গেলে পুনরুদ্ধারে কয়েক দশক সময় লাগে। এখনই পানি ব্যবস্থাপনা না বদলালে বরেন্দ্র অঞ্চল মরুকরণের দিকে যাবে।”
অন্যদিকে, কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন—
> “সেচ বন্ধ করার পাশাপাশি বিকল্প জল ব্যবস্থাপনা যেমন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, সোলার পাম্প, খাল পুনঃখনন জরুরি।”
বিডিও–র ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ করণীয়
বিডিও বহু বছর ধরে যে সতর্কবার্তা দিচ্ছিল, তা অবশেষে বাস্তবায়ন হয়েছে। সংস্থাটি উপজেলা–ইউনিয়ন পর্যায়ে—
জনসচেতনতা বৃদ্ধি
জল সংরক্ষণ প্রশিক্ষণ
সেচে পানির সঠিক ব্যবহার
বৃষ্টির পানি ধরে রাখার পদ্ধতি
এসব কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করতে চায়।
বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সংকট শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়—এটি কৃষি, অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িত।
সরকারের এই গেজেট পানির অপব্যবহার রোধে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, বিকল্প পানি ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে সংকট আরও বাড়তে পারে।
বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষের এখন সবচেয়ে বড় চাওয়া—
“পানি বাঁচুক, কৃষি বাঁচুক, বরেন্দ্র বাঁচুক।”



মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সরিষাবাড়ীতে দিনব্যাপী কর্মশালা

1

কাহালুতে ইয়াবা সহ মাদক বিক্রেতা লিমনকে গ্রেফতার করেছে থানা

2

পুলিশের Backbone: এসআইদের অঘোষিত ত্যাগ

3

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫ সীমান্তে অভিযান চালিয়ে ১০টি ও ২টি মহিষ আ

4

টাংগাইলের নাগরপুরে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী লাভলুর সংবাদ সম্ম

5

শিরোমণি বাজার বণিক সমিতির নির্বাচনে ১১ টি পদের বিপরীতে ৩৬ জন

6

নবীগঞ্জে সি,এন জি চালকের মৃত্যু

7

কমলনগরে সাবেক মহিলা মেম্বারের পতিতালয়ে আগুন দিল বিক্ষুব্ধ জন

8

মধুপুরের মামলায় ঘাটাইল থেকে চার আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেত

9

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত অতিক্রম রোধে তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে

10

সুবর্ণচরে তুলার গোডাউনের আগুনে পুড়লো প্রতিবন্ধীর ভ্যানগাড়ি

11

ভোজগাতী ইউনিয়নে হাতপাখার প্রার্থীর তুমুল গণসংযোগ, ইসলামী আন

12

কাঁচপুরে কোস্ট গার্ডের অভিযানে বিপুল পরিমাণ জাটকা জব্দ

13

নরসিংদীতে ২ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার

14

সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন

15

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করেছ

16

ভারতে আড়াই বছর করাভোগ শেষে বেনাপোল দিয়ে দেশে ফিরল মা-ছেলে

17

রায়গঞ্জে ক্ষিরতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিজয় দিবস ২০২৫

18

বগুড়া সদর উপজেলায় গৃহবধূকে শ্বাসরোধ করে হত্যা

19

পটুয়াখালী মিথ্যা মামলা ও হয়রানির প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন

20