মহিব উল্লাহ মহিব
নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চর জব্বর ডিগ্রি কলেজে চলছে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দিয়ে।টানা চার বছর ধরে পূর্ণাঙ্গ অধ্যক্ষ নিয়োগ না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অস্বচ্ছতা, অনিয়ম ও প্রশাসনিক স্থবিরতা দেখা দিয়েছে ।
জানা যায়, ২০২১ সালের ডিসেম্বর কলেজটি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের মাধ্যমে চলছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধান অনুযায়ী কোনো কলেজে অধ্যক্ষ অবসরে গেলে ছয় মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ অধ্যক্ষ নিয়োগ বাধ্যতামূলক। প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান সাজু অবসরে যাওয়ার পর সাবেক ভাইস উপাধ্যক্ষ গিয়াস উদ্দিন ফরহাদ পরবর্তী তিন বছর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
কলেজ সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে দায়িত্ব পালন করছেন ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক জামসেদুর রহমান কিসলু। যিনি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরেই অবসরে যাবেন। গত চার বছরের ধারাবাহিকতায় তিনিও দীর্ঘসময়ের জন্য ভারপ্রাপ্ত হিসেবেই দায়িত্বে বহাল থাকবেন বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে জাতীয়করণের মামলা ও পাঁচ সদস্যের শিক্ষক সিন্ডিকেটের তদবিরে গভর্নিংবডির যোগসাজশে কলেজে স্থবিরতার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সাবেক শিক্ষার্থী মুহিব উল্লাহ মুহিব অভিযোগ করে বলেন, ' এই কলেজ ২০১৬ সালে জাতীয়করণের তালিকা থেকে বাদ পড়ে, পরে দেশের বিভিন্ন জেলার একাধিক কলেজ আদালতে মামলা করে। সেই তালিকার ১১টি কলেজের মধ্যে চর জব্বর ডিগ্রি কলে রয়েছে। মামলাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কলেজের একটি প্রভাবশালী গ্রুপ ইচ্ছাকৃতভাবে পূর্ণাঙ্গ অধ্যক্ষ নিয়োগ দিচ্ছে না।
তাঁর অভিযোগ , ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদে থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা, গভর্নিং বডির অভ্যন্তরীণ যোগসাজশ এবং ভুল তথ্য দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে বিভ্রান্ত করাই নিয়োগ স্থগিতের মূল কারণ।
কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য সিরাজ হায়দার বলেন, কলেজের কিছু কর্মকর্তা ও শিক্ষক মিলে পাঁচ সদস্যদের সিন্ডিকেট প্রশাসনিক ক্ষমতা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে পুরো কলেজ পরিচালনার চেষ্টা করছেন।
তিনি আরো বলেন, একই জাতীয়করণ তালিকার আরেক কলেজের উদাহরণে রংপুর জেলার কাউনিয়া ডিগ্রি কলেজ একই মামলার তালিকায় থাকা সত্ত্বেও ২০২২ সালেই পূর্ণাঙ্গ অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ নিয়োগ সম্পন্ন করেছে।
কাউনিয়া কলেজের অবসরপ্রাপ্ত উপাধ্যক্ষ বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনো মামলা ১০ থেকে ১৫ বছরও চলতে পারে। কোনো অধ্যক্ষের যদি চাকরির মেয়াদই না থাকে, তবে তিনি এত দীর্ঘ সময় কীভাবে একই পদে বহাল থাকবেন? আবার পূর্ণাঙ্গ অধ্যক্ষ ছাড়া একটি কলেজ সুষ্ঠুভাবে কীভাবে পরিচালিত হবে? তাঁর মতে, গভর্নিং বডি চাইলে নিয়ম মেনে নিয়োগ দিতেই পারত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী জানান, চরজব্বর কলেজে দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণাঙ্গ অধ্যক্ষ না থাকার কারণে প্রশাসনিক অনিয়ম, আর্থিক লেনদেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নামে বেনামে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছে।
নোয়াখালী সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত সাবেক অধ্যক্ষ আল হেলাল মোশারফ বলেন, 'যেখানে বিধি অনুযায়ী ছয় মাসের মধ্যে নিয়োগ বাধ্যতামূলক, সেখানে চার বছর ধরে কলেজটি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দিয়ে চলছে কীভাবে? মামলার অজুহাতে অন্য কলেজগুলোতে নিয়োগ হতে পারলে চর জব্বর এর ব্যতিক্রম হবে না।
গত কয়েকবছর ধরে চর জব্বর ডিগ্রি কলেজের বেশিরভাগ প্রশাসনিক কাজ,অতিরিক্ত ফি,বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কমিটিতে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার অভিযোগ রয়েছে পাঁচ শিক্ষকের।
পরীক্ষা কমিটি,অর্থ ও ক্রয় কমিটি, উন্নয়ন কমিটি, বেতন ও ফি আদায় কমিটি,শিখন মূল্যায়ন কমিটি, উপবৃত্তি সিলেকশন কমিটি,অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটি ও নিরীক্ষা কার্যক্রম ঐ সিন্ডিকেটের শিক্ষক অথবা তাদের আস্থাভাজনদের দিয়ে গঠন করা হয়ে থাকে। ফলে কলেজটির আয় ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও পরিচালনা অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠছে বার বার।
অভিযুক্ত সিন্ডিকেট ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জামসেদুর রহমান কিসলু'র নেতৃত্বে অন্য সদস্যরা হলেন মানবিক বিভাগের প্রভাষক বেলাল হোসেন ভুট্টু, ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রফিকউল্লাহ, প্রভাষক সাফিয়া সুলতানা, ইতিহাস বিভাগের আনোয়ার হোসেন ও ফারুক হোসেন।
চরজব্ব কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো জামশদুর রহমান কিসলু বলেন, আমি দায়িত্ব পালন করছি মাত্র ১০ মাস আমার দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে কোন ধরনের অনিয়মের ঘটনা ঘটেনি। বরং কলেজে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। একশ্রেণীর মানুষ এই উন্নয়ন ও অগ্রগতি সহ্য করতে পারছেন না বলে তারা তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলেছেন। তাদের কোন অভিযোগ এই সত্য নয়।