জনতার খবর রিপোর্টার
প্রকাশঃ 28-ডিসেম্বর-2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

নীলপদ্মের ঘ্রাণে বিষ

ইরি অতনু

​বিকেলের তপ্ত রোদ তখন মরে এসেছে। কুষ্টিয়ার রেনউইক বাঁধের ধারে গড়াই নদীর বাতাসে স্নিগ্ধতা। বন্ধু-বান্ধবের সাথে আড্ডা দিতে দিতেই হঠাৎ সৌরভের চোখ আটকে গেল। বকুল গাছের তলায় দাঁড়িয়ে এক তরুণী। পরনে হালকা নীল শাড়ি, খোলা চুলে বাতাসের খেলা। সৌরভের মনে হলো, পুরো পৃথিবীটা থমকে দাঁড়িয়েছে। সেই মুহূর্তে তার মনে যে হিল্লোল বয়ে গেল, তা যেন অকাল বসন্তের এক দমকা হাওয়া।
​সৌরভ সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের শান্ত ছেলে। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের মায়া তাকে এমনভাবে গ্রাস করল যে, সে পড়াশোনা-ঘরবাড়ি সব ভুলে ওই পার্কের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেল। মেয়েটি প্রতিদিন বিকেলে তার বান্ধবীদের নিয়ে পার্কে আসে, ফুচকা খায়। তাকে কাছ থেকে দেখার জন্য সৌরভ এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসল। পার্কের মোড়ের ফুচকাওয়ালার সাথে খাতির জমিয়ে সে নিজেই ফুচকা বানানো শুরু করল।
​সৌরভ জানত, নাম না জানলে এই ভালোবাসা অপূর্ণ। একদিন ফুচকা দিতে গিয়েই জানল—নাম তার অহনা। অহনাও খেয়াল করেছিল এই অদ্ভুত ফুচকাওয়ালাকে, যার চোখে একরাশ স্বপ্ন আর মমতা। বন্ধুত্ব থেকে প্রেম হতে বেশি সময় লাগেনি। কুষ্টিয়ার সেই ছোট শহর সাক্ষী থাকল এক পবিত্র প্রেমের।

​সময় বয়ে যায় আপন গতিতে। দেখতে দেখতে সাতটি বছর কেটে গেল। সৌরভ এখন কুষ্টিয়ার এক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র। এই সাত বছরে অহনার সাথে তার সম্পর্কটা কেবল আবেগ নয়, অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে সৌরভের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হয়ে ওঠে সোহান। সোহান স্মার্ট, বাকপটু এবং কিছুটা উচ্চাভিলাষী।
​সৌরভ সরল বিশ্বাসে সোহানকে তার সাত বছরের প্রেমের গল্প শোনায়। একদিন অহনার সাথে সোহানের পরিচয় করিয়ে দেয়। কিন্তু সেই পরিচয়ই যে কাল হয়ে দাঁড়াবে, তা সৌরভ ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। অহনাকে প্রথম দেখেই সোহানের ভেতরে এক বিষাক্ত লালসা আর ঈর্ষা জন্ম নেয়। সে মনে মনে ভাবল, "সৌরভের মতো সাধারণ ছেলের পাশে এত সুন্দরী মেয়ে মানায় না।"

​সোহান জানত, সরাসরি আক্রমণ করলে কাজ হবে না। সে শুরু করল সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক খেলা। সে জানত বর্তমান সময়ে তরুণ-তরুণীদের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা কোথায়—সন্দেহ আর ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তা।
​সে অহনার কাছে গিয়ে সৌরভের নামে বানিয়ে বানিয়ে কথা বলতে শুরু করল। কখনো রাজনীতির দোহাই দিয়ে বলল, "সৌরভ ক্যাম্পাসে নোংরা রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ছে, ওর ক্যারিয়ার শেষ।" কখনো আবার কোনো এক কাল্পনিক মেয়ের নাম করে বলল, "সৌরভ আজকাল অমুক মেয়ের সাথে মেলামেশা করছে, আমি বন্ধু হিসেবে তোকে সতর্ক করছি।"
​সোহান অত্যন্ত চতুরতার সাথে কিছু ভুয়া মেসেজ আর এডিট করা ছবি তৈরি করল। অহনা প্রথমে বিশ্বাস করতে চায়নি, কিন্তু সোহানের বারবার বলা "শুভাকাঙ্ক্ষী"সুলভ কথাগুলো তার মনে বিষ ঢেলে দিল। সৌরভ লক্ষ্য করল, অহনা ইদানীং খুব খিটখিটে হয়ে গেছে। কথা বললেই ঝগড়া বাধে।
​অহনা একদিন কাঁদতে কাঁদতে বলল,
​"সৌরভ, আমি কি তোকে চিনতে ভুল করেছি? রাজনীতির নেশায় বা অন্য মেয়ের মোহে তুই কি আমাদের সাত বছরের সম্পর্কটা ভুলে যাবি?"


​সৌরভ আকাশ থেকে পড়ল। সে যতবার বোঝাতে চাইল, সোহানের বুনা মিথ্যার জাল তত বেশি তাকে জড়িয়ে ধরল। মাঝখানে সোহান এসে "শান্ত্বনা"দাতা সেজে অহনার আরও কাছে যাওয়ার চেষ্টা করল।

​এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় সোহান অহনাকে ফোন করে জানাল, সৌরভ নাকি এক বড় ঝামেলায় পড়েছে, তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে এক মেয়ের সাথে ঝামেলার কারণে। অহনা তখন মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। সোহান তাকে সাহায্যের নাম করে কুষ্টিয়া শহরের বাইরে এক নির্জন এলাকায় নিয়ে গেল।
​সোহানের পরিকল্পনা ছিল অহনাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়ে তার দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া। সে তাকে বোঝাতে চাইল, সৌরভ তাকে কোনোদিন নিরাপত্তা দিতে পারবে না। কিন্তু অহনার মনের গভীরে তখনও সেই 'ফুচকাওয়ালা' সৌরভের প্রতি এক চিলতে বিশ্বাস অবশিষ্ট ছিল।
​নিভৃতে সোহানের চাউনি আর তার কথা বলার ধরন দেখে অহনা হঠাৎ চমকে উঠল। সে বুঝতে পারল, যে বন্ধুটি এত দিন সৌরভের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছে, তার উদ্দেশ্য মোটেও পবিত্র নয়। সোহান যখন অহনার হাত ধরার চেষ্টা করল, অহনা তীব্র ঘৃণায় নিজেকে সরিয়ে নিল।

​ঠিক সেই মুহূর্তে সৌরভ সেখানে হাজির হলো। সে সোহানের আচরণে আগে থেকেই সন্দেহ করেছিল। সে সোহানের পিছু নিয়েছিল নিজের ভালোবাসা আর সম্মান বাঁচাতে। সোহান যখন অহনার ওপর চড়াও হতে চাইল, সৌরভ গর্জে উঠল।
​সৌরভ শান্ত গলায় সোহানকে বলল,
​"বন্ধুত্বের যে অমর্যাদা তুই করলি, তার বিচার হয়তো আমি করব না, কিন্তু আমাদের সাত বছরের বিশ্বাস এত ঠুনকো নয় যে তোর মতো আগাছা তাকে উপড়ে ফেলবে।"

​সোহান বুঝতে পারল তার সব চক্রান্ত ফাঁস হয়ে গেছে। সে পরাজিত সৈনিকের মতো সেখান থেকে পালিয়ে বাঁচল। বৃষ্টির ঝাপটায় সেদিন সব কালিমা ধুয়ে গেল। অহনা ডুকরে কেঁদে উঠল সৌরভের বুকে মাথা রেখে। সে বুঝতে পারল, বাইরের জগতের রাজনীতি, কুৎসা বা অন্য কোনো প্রলোভন সৌরভের মতো খাঁটি মানুষের বিকল্প হতে পারে না।

​কুষ্টিয়ার সেই পার্কটি আজও আছে। আজও সেখানে নীলপদ্ম আছে। শুধু নেই সেই বিষ! যা নীলপদ্মকে গ্রাস করতে চেয়েছিলো! সৌরভ আর অহনা এখন একে অপরের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সমাজ, পরিবার আর স্বার্থপর বন্ধুদের শত বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে তারা প্রমাণ করেছে যে, সত্যিকারের ভালোবাসা কোনো মিথ্যার কাছে হার মানে না।
​বসন্তের সেই প্রথম হাওয়ার মতো সৌরভের ভালোবাসা আজও অহনার মনে স্নিগ্ধতা ছড়ায়। আর সোহানরা ইতিহাস হয়ে হারিয়ে। যায় অন্ধকারের অতল গহ্বরে, যেখানে ঈর্ষা আর ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না ।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

স্মরণকালের সবচেয়ে বড়’ মহাসমাবেশ আয়োজনে প্রস্তুত চট্টগ্রাম

1

চাঁপাইনবাবগঞ্জে নির্বাচনে নিরাপত্তা দায়িত্ব পালনে ৫৩ বিজিবি

2

গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সকল কাঠামো সংস্কারের আওতায় আসবে- শ

3

শোক পালনের মধ্য দিয়ে ঝালকাঠিতে যুবদলের ৪৭ তম প্রতিষ্ঠা বার্

4

রোয়াংছড়িতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিদায় ও বরণ সংবর্ধনা

5

কুলিয়ারচরে সরকারি জায়গা থেকে ২ লাখ টাকার গাছ কাটার অভিযোগ

6

সড়ক দুর্ঘটনায় আবারো একজন বৃদ্ধ নিহত

7

ইসলামপুর ইউনিয়নে সরকারি সারের ডিলার অনিয়মে কৃষকদের চরম ভোগা

8

রায়গঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত

9

নাসির নগরে সাবেক বিএনপি নেতা এস এ কে একরামুজ্জানের আবেকঘন

10

জাবিতে সিরাজগঞ্জ জেলা ছাত্রকল্যাণ সমিতির সভাপতি,সম্পাদক তাড়া

11

বান্দরবান, জেলার,লামা-আলীকদম প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠার, সংক্ষিপ্

12

নাসিরনগরে স্বতন্ত্র প্রার্থী এ কে এম কামরুজ্জামান মামুন এর জ

13

মাদারীপুর ০৩ আসনে-ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত সংসদ সদস্য

14

নিয়ামতপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় কলেজ ছাত্র নিহত, আহত-২

15

পাবনায় পদোন্নতিপ্রাপ্ত পাঁচজন পুলিশ সদস্যকে র‌্যাংক ব্যাজ পর

16

গাবতলীতে হত্যা মামলার এজাহারভুক্তসহ ৬ আসামি গ্রেফতার

17

খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের উন্নতি: ডা. জাহিদ

18

পাবনায় সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিশুশিক্ষার্থীসহ তিনজন নিহত

19

টুঙ্গিপাড়ায় ইউপি চেয়ারম্যান ও সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্যের

20