শরিফুল
বগুড়ার গাবতলী ও সারিয়াকান্দি উপজেলায় সমাজ উন্নয়ন কর্ম (সার্ক) নামের একটি সমিতিকে কেন্দ্র করে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। বছরের পর বছর অধিক মুনাফার লোভ দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা কোটি কোটি টাকা হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেছে। অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে শত শত পরিবারে জমা রাখা সঞ্চয়—মানুষের মুখে এখন শুধু হতাশা, কান্না আর দীর্ঘশ্বাস।
স্থানীয়দের ভাষ্য—এই দুই উপজেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু একটাই প্রশ্ন:
“সার্কের টাকাগুলো কি আর কোনোদিন ফেরত পাওয়া যাবে?”
দূর্গাহাটা, ফুলবাড়ি, হরিনা, উত্তরপাড়া—সকল এলাকায় প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগীদের দীর্ঘ তালিকা। বহু পরিবারের স্বপ্ন, কষ্টার্জিত সঞ্চয় ও ভবিষ্যতের ভরসা মুহূর্তেই ভেঙে পড়েছে।
হরিনা উত্তরপাড়ার আমেনা বেগমের চিত্র আরও হৃদয়বিদারক। মাটি কাটার পর জমানো অর্থ অধিক মুনাফার আশায় জমা করেছিলেন সার্ক সমিতিতে। কিন্তু টাকা ফেরত চাইতে গেলে সমিতির পরিচালক আশরাফুল ইসলাম স্বপন তাকে হুমকি দেন। দীর্ঘদিন অপেক্ষা, টাকার দুশ্চিন্তা—শেষ পর্যন্ত স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তিনি এখন প্যারালাইজড অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
এলাকার ব্যবসায়ী মো. তারেক জানালেন আরও ভয়াবহ তথ্য। ডিপিএসের টাকা চাইতে গেলে উল্টো তারই বিরুদ্ধে চেকের মামলা করে সমিতির কর্তৃপক্ষ। তিনি বলেন, “টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে নিজেই আসামি হয়ে গেলাম।”
প্রতারিতদের মধ্যে রয়েছেন সমিতির নৈশপ্রহরী লক্ষী চন্দ্র মালীও। তিনি জানান—“সময় লাগবে” এই অজুহাতে তাকে বারবার ঘুরিয়ে এক টাকাও ফেরত দেওয়া হয়নি। কর্মচারী হয়েও রক্ষা পাননি তিনি।
প্রবাসী সুলতান বাহাদুরের স্ত্রী পাঁচ বছরের ডিপিএস করেছিলেন ২০ শতাংশ মুনাফার কথা শুনে। সাত বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো টাকা ফেরত পাননি। বরং সমিতির সবকিছু হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দুই উপজেলার শত শত গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা সংগ্রহের পর পরিচালক আশরাফুল ইসলাম স্বপন সব কার্যক্রম গুটিয়ে ‘গা-ঢাকা’ দিয়েছেন।
এ বিষয়ে গাবতলী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওবায়দুল হক জানান, সমিতিটির নিবন্ধন আপাতত স্থগিত রয়েছে। তিনি বলেন,
“ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবুও মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে একই প্রশ্ন—
“আমাদের কষ্টার্জিত টাকা কি কোনোদিনও ফেরত আসবে?”
ভুক্তভোগীরা দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ, তদন্ত এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
সার্ক সমিতির এই প্রতারণা আবারও মনে করিয়ে দিল—অধিক মুনাফার ফাঁদে পড়ে সাধারণ মানুষ কত সহজেই নিঃস্ব হয়ে যায়। আর একেক পরিবারের সেই ভেঙে পড়া স্বপ্নগুলো আজ গ্রামজুড়ে হতাশার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।