মোঃ রাতুল হাসান লিমন
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি ঐতিহাসিক মুহূর্তে নারায়ণগঞ্জের নারীরা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এসে সেই চিত্র পুরোপুরি উল্টো। জেলার পাঁচটি আসনের কোনো একটিতেও নেই নারী প্রার্থী।
নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ইতিহাসে নারীদের অংশগ্রহণ বরাবরই দৃশ্যমান। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান—সব পর্যায়েই নারায়ণগঞ্জের নারীরা ছিলেন রাজপথে। এমনকি গত বছরের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সংগঠিত ও বিস্তারে নারীদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। নারী শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী নারী ও রাজনৈতিক কর্মীদের সক্রিয়তায় সেই আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এসে সেই শক্তিশালী উপস্থিতি পুরোপুরি অনুপস্থিত। দীর্ঘ একদলীয় শাসনের অবসানের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় যেখানে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বিস্তৃত হওয়ার কথা ছিল, সেখানে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনের একটিতেও কোনো নারী প্রার্থী নেই।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, তফসিল ঘোষণার পর জেলার পাঁচটি আসনে মোট ৯৩ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে জমা পড়ে ৫৬টি। যাচাই-বাছাই শেষে ৩৬ জনকে বৈধ প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হলেও সেখানে কোনো নারীর নাম নেই।
যদিও শুরুতে দুই নারী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। তাদের একজন মনোনয়নপত্র জমা দেননি, আরেকজন যাচাই-বাছাইয়ে বাদ পড়েন। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন মোসা. নারগিস আক্তার। তিনি বন্দর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেনের স্ত্রী হলেও শেষ পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেননি।
অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন সদর উপজেলার সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ফাতেমা মনির। তবে এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরে ত্রুটি থাকায় তার প্রার্থিতা বাতিল হয়। ফলে সম্ভাব্য একমাত্র নারী প্রার্থীর পথও আপাতত বন্ধ হয়ে যায়। যদিও সংশোধন ও আপিলের মাধ্যমে ফেরার আইনি সুযোগ পুরোপুরি শেষ হয়নি, তবু এখন পর্যন্ত তিনি বৈধ প্রার্থীর তালিকায় নেই।
এই দুইজন ছাড়া আর কোনো নারী নির্বাচনে আগ্রহ দেখাননি। কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলও নারায়ণগঞ্জের কোনো আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি। বিএনপি থেকে নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাংগঠনিক সম্পাদক পারভীন আক্তার। তবে দলটি তাকে বিবেচনায় না এনে সহসাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদকে প্রার্থী করে, যিনি আগেও ওই আসনে পরাজিত হয়েছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। বরং পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার কাঠামোই আগের মতোই সক্রিয় রয়েছে। জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে দলগুলোর নেতৃত্ব কাঠামোয় নারীর উপস্থিতি বাড়েনি, যা বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই প্রতিচ্ছবি।
এ পরিস্থিতিতে হতাশা প্রকাশ করেছেন ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ফারহানা মানিক মুনা। তিনি বলেন,
“নারায়ণগঞ্জে কোনো নারী প্রার্থী না থাকা দেখিয়ে দেয় যে আন্দোলনের রাজপথ থেকে ব্যালট পর্যন্ত নারীদের যাত্রাপথ এখনো সংকুচিত। সমস্যাটা শুধু নির্বাচনে অংশগ্রহণের নয়, বরং পেশিশক্তি-নির্ভর রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নারীর অবস্থান ক্রমাগত অবমূল্যায়িত হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন,
“যে কাঠামোর পরিবর্তনের জন্য অভ্যুত্থান হয়েছিল, সেই কাঠামোর মধ্যেই নারীরা সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। মিছিলে নারীর উপস্থিতি গ্রহণযোগ্য হলেও ক্ষমতার সিদ্ধান্তমূলক জায়গায় তাদের অংশগ্রহণে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিকতার অভাব স্পষ্ট।”
রাজধানীর পাশের একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলায় নারীশূন্য প্রার্থী তালিকা নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।