Mst: Meherun Nesa
প্রকাশঃ 11-নভেম্বর-2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান

সঞ্জয় দেবনাথ
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশের অন্যতম জাতীয় উদ্যান এবং অবশিষ্ট চিরহরিৎ বনাঞ্চলের একটি উল্লেখযোগ্য নমুনা। এটি একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। বাংলাদেশের ৭টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও ১০টি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে এটি অন্যতম। মৌলভীবাজার কমলগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত ১২৫০ হেক্টর আয়তনের এ বন জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। লাউয়াছড়া উদ্যানে বাংলাদেশ বন বিভাগ কর্তৃক স্থাপিত তথ্য বোর্ড। বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে এই বনকে 'জাতীয় উদ্যান' হিসেবে ঘোষণা করে। বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের জন্য এ বন বিখ্যাত। উল্লুক ছাড়াও এখানে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির দুর্লভ জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ এবং উদ্ভিদ।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান
বাংলাদেশে অবস্থান মৌলভীবাজার জেলা, সিলেট বিভাগ,  কমলগঞ্জ  উপজেলা

নিরক্ষীয় অঞ্চলের চিরহরিৎ অতিবৃষ্টি অরণ্যের মতো এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। সূর্যের আলোর জন্য প্রতিযোগিতা করে এ বনের গাছপালা খুব উঁচু হয়ে থাকে, এবং অনেক ওপরে ডালপালা ছড়িয়ে চাঁদোয়ার মত সৃষ্টি করে। এই অরণ্য এতই ঘন যে মাটিতে সূর্যের আলো পড়েনা বললেই চলে। এটিকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অতিবৃষ্টি অরণ্য এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

বাংলাদেশের বিখ্যাত বনগুলোর মধ্যে লাউয়াছড়ার বন অন্যতম। পরিচিতির দিক থেকে সুন্দরবনের পরেই লাউয়াছড়ার বনের অবস্থান। সিলেট বিভাগে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় এ বন অবস্থিত। ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে তদানিন্তন ব্রিটিশ সরকার এখানে বৃক্ষায়ন করলে তা-ই বেড়ে আজকের এই বনে পরিণত হয়। শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার মৌলভীবাজার ফরেস্ট রেঞ্জের আওতাধীন ২,৭৪০ হেক্টর আয়তনের পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বন ছিলো এলাকাটি, সেই সুবাদে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পূর্ববতী নাম পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বন। বনের অস্তিত্ব ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি প্রকৃতি ভ্রমণ ও জনসচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পশ্চিম ভানুগাছ বনের ১,২৫০ হেক্টর এলাকাকে ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) (সংশোধন) আইন অনুযায়ী ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে 'জাতীয় উদ্যান' হিসাবে ঘোষণা করা হয়।

চিরহরিৎ এ বনে নিরক্ষীয় অঞ্চলের বর্ষাবন বা রেইনফরেষ্টের বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। একসময় বৃহত্তর সিলেটের সর্বত্রই এ ধরনের বন ছিলো। তবে বাণিজ্যিকভিত্তিতে চা বাগান সৃষ্টি, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ এবং নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে ক্রমে সংকুচিত হতে হতে মাত্র কয়েকটি স্থানে চিরহরিৎ এ বর্ষাবনের অস্তিত্ব টিকে রয়েছে।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভূপ্রকৃতি পাহাড়ি মৃত্তিকা গঠিত। উঁচু-নিচু টিলা জুড়ে এ বন বিস্তৃত। বনের মাটিতে বালুর পরিমাণ বেশি এবং প্রচুর পাথর দেখা যায়। বনের মাটিতে পাতা জমে জমে পুরু স্পঞ্জের মতো হয়ে থাকে, জায়গায় জায়গার মাটিই দেখা যায় না। এসব স্থানে জোঁকের উপদ্রপ খুব বেশি। বনের ভেতর দিয়ে অনেকগুলো পাহাড়ি ছড়া বয়ে চলেছে। এসব ছড়ার কয়েকটি ছাড়া বাকিগুলোতে শুধু বর্ষার সময়ই পানি থাকে। ছড়ার পানি পরিষ্কার টলটলে এবং ঠান্ডা। যেসব ছড়াতে শুষ্ক মৌসুমেও পানি থাকে সেসব ছড়ার কাছে বন্যপ্রাণীর আনাগোনা দেখা যায়।

লাউয়াছড়ার বনে বাঁশ ঝাড় ও বেতের ঝোঁপ

জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে লাউয়াছড়ার জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশের সমৃদ্ধতম বনগুলোর একটি। আয়তনে ছোট হলেও এ বন দুর্লভ উদ্ভিদ এবং প্রাণীর এক জীবন্ত সংগ্রহশালা। বনে প্রবেশের সাথে সাথেই নানা ধরনের বন্যপ্রাণী, পাখি এবং কীটপতঙ্গের শব্দ শোনা যায়। বনের মধ্যে প্রায় সারাক্ষণই সাইরেনের মত শব্দ হতে থাকে; প্রকৃতপক্ষে এটি এক ধরনের ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ। লাউয়াছড়ার জাতীয় উদ্যানে ৪৬০ প্রজাতির দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪ প্রজাতির উভচর, ৬ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি এবং ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী দেখা যায়।

এ বনে স্তন্যপায়ী আছে নানা প্রজাতির। বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের জন্য এ বন বিখ্যাত। বনের মধ্যে কিছু সময় কাটালেই উল্লুকের ডাকাডাকি কানে আসবে। উল্লুক ছাড়াও এখানে রয়েছে চশমাপরা হনুমান, লজ্জাবতী বানর, মুখপোড়া হনুমান, বানর, শিয়াল, মেছোবাঘ, রামকুত্তা, এশীয় কালো ভাল্লুক, মায়া হরিণ সহ নানা প্রজাতির জীবজন্তু। মায়া হরিণ সাধারণত উচ্চতায় ২০‌-২২ ইঞ্চি। এদের বাদামী রঙের দেহ যা পিঠের দিকে ঘিয়ে গাঢ় রং ধারণ করে।

এ বনে সরীসৃপ আছে নানা প্রজাতির। তার ভেতর অজগর হচ্ছে অনন্য। এখানে পাওয়া যায় হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ।

উদ্যানের বন্য পাখির মধ্যে সবুজ ঘুঘু, লাল বনমোরগ, তুর্কি বাজ, সাদামাথা সাতভায়লা, ঈগল, হরিয়াল, কালোমাথা টিয়া, কালো-পিঠ চেরালেজি, ধূসরাভ সাত সহেলি, প্যাঁচা, কালো ফিঙে, বাসন্তী লটকনটিয়া, কালো বাজ, লালমাথা টিয়া, কালো-মাথা বুলবুল, পরঘুমা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। সাধারণ দর্শনীয় পাখির মধ্যে সবুজ টিয়া, ছোট হরিয়াল, সবুজ বাঁশপাতি, তোতা, পান্না কোকিল, পাঙ্গা, কেশরাজ প্রভৃতির দেখা মিলে।

এছাড়া ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে সিতেশ রঞ্জন দেব তার চিড়িয়াখানা থেকে দুটি লক্ষ্মীপেঁচা ও একটি বন বিড়ালও অবমুক্ত করেন এ বনে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মণিরামপুরের খানপুর ইউনিয়ন যুব আন্দোলনের কমিটি গঠন

1

তারাগঞ্জে এক ব্যক্তির গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার

2

ঘাটাইলে ফুটপাত দখল করে দোকান

3

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে প্রকাশ্যে চাপাতি দেখিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টিক

4

চট্টগ্রাম–১৫: জোট ছাড়া বিএনপির লড়াই

5

জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে শাসক হিসেবে নয় একজন সেবক হয়ে কাজ ক

6

সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন সদস্যদের অ্যাডভোকেসি বিষয়ক দুই দ

7

নাসিরনগরে ফিরছে সরিষা চাষের ঐতিহ্য

8

১৩ দফা দাবি নিয়ে চট্টগ্রামে ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে বৃহত্তর

9

ঝালকাঠি নদী থেকে ভাসমান মৃতদেহ উদ্ধার

10

কালিগঞ্জে উপজেলা বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুৃষ্ঠিত

11

ইতিহাস কখনো জোর করে মুছে ফেলা যায় না

12

কালিহাতীতে অবসরপ্রাপ্ত জাদুঘর কর্মচারীর রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার

13

চাঁপাইনবাবগঞ্জে শহীদ বুদ্ধিজীবী ও বিজয় দিবস উদযাপনে প্রস্তু

14

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ৪ মানব পাচারকারী আটক

15

সাংবাদিক শাওন আমিনের পরিবারকে নিয়ে ফেসবুকে মিথ্যা অপপ্রচার

16

চান্দিনা সেবা সংস্থার বাড়েরা ইউনিয়ন সম্মেলন অনুষ্ঠিত

17

নগরীর ট্রাফিক শৃঙ্খলা নিশ্চিতে সিএমপি ট্রাফিক বিভাগের বিশেষ

18

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ছাত্র-যুব সমাবেশ অনুষ্ঠিত

19

কমলগঞ্জে বাড়ির পাশে যুদ্ধকালীন গ্রেনেড, এলাকা ঘেরাও

20