মোঃ আবু সায়েম
নওগাঁ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কৃষকদের মধ্যে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বস্তায় আদা চাষ। অল্প পুঁজিতে, কম জায়গায় এবং সহজ পদ্ধতিতে ভালো ফলন পাওয়ায় এ চাষ এখন গ্রামীণ অর্থনীতির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে নতুন দিগন্ত
একসময় নওগাঁর কৃষকরা আদা চাষের জন্য উন্মুক্ত জমি ব্যবহার করতেন। কিন্তু বর্তমানে পতিত জমি ও আমবাগানের নিচে বস্তা ব্যবহার করে আদা চাষ শুরু হয়েছে, যা কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।
নওগাঁ সদর উপজেলার কাদোয়া বটতলা গ্রামের সোহেল রানা, নিয়ামতপুরের হরিপুর গ্রামের শরিফুল ইসলাম, এবং মান্দার নাড়াডাঙ্গা গ্রামের আবু বক্কর সিদ্দিক সোহেল — এরা সবাই বস্তায় আদা চাষ করে সাফল্যের মুখ দেখেছেন।
বিডিও-র সহযোগিতায় বিস্তৃতি
বরেন্দ্র ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (বিডিও), নিয়ামতপুর অফিসের উদ্যোগে ও কারিগরি সহায়তায় প্রথমে হাজীনগর ইউনিয়নের ১৬টি পরিবারে পরীক্ষামূলকভাবে এই পদ্ধতি চালু করা হয়।
চাষের ফলাফল আশাব্যঞ্জক হওয়ায় বর্তমানে তা ৪০টি পরিবারে বিস্তৃত হয়েছে এবং আরও ২৫টি পরিবারকে আদা বীজ, বস্তা ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
চাষের প্রক্রিয়া ও সুবিধা
বস্তায় আদা চাষের ধাপসমূহ:
প্রতি বস্তায় ৮–১০ কেজি উর্বর মাটি ও গোবর সার মিশিয়ে বীজ আদা রোপণ।
নিয়মিত পানি দেওয়া ও আগাছা পরিষ্কার ছাড়া বিশেষ যত্নের প্রয়োজন নেই।
৬–৭ মাসের মধ্যে আদা সংগ্রহযোগ্য হয়।
সুবিধা:
পতিত জমির সদ্ব্যবহার
মাটির উর্বরতা নষ্ট হয় না
বৃষ্টির পানি বা রোদে ক্ষতির আশঙ্কা নেই
ফলন তুলনামূলকভাবে বেশি।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
গড়ে প্রতি বস্তায় ২–৩ কেজি আদা উৎপাদন সম্ভব। একজন কৃষক ৫০–১০০ বস্তা ব্যবহার করলে প্রায় ২০–২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করতে পারেন।
স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাজারে আদার দাম স্থিতিশীল থাকলে এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে।
উপজেলা ভিত্তিক সম্প্রসারণ
বর্তমানে নওগাঁর সদর, নিয়ামতপুর, মান্দা, মহাদেবপুর, রানীনগর উপজেলায় এই চাষ সবচেয়ে বেশি হচ্ছে।
এছাড়া পত্নীতলা, পোরশা, সাপাহার ও ধামইরহাট উপজেলাতেও কৃষকরা যুক্ত হচ্ছেন বস্তায় আদা চাষে।
ধীরে ধীরে পুরো জেলাজুড়ে এটি ক্ষুদ্র কৃষকদের আয়ের বিকল্প উৎস হিসেবে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
কৃষকদের অভিমত
কৃষক সোহেল রানা বলেন,
> “আমি শুরুতে মাত্র ২০ বস্তায় আদা চাষ করেছিলাম। এখন ৭০ বস্তায় করেছি। ফলন ভালো হয়েছে, খরচও কম।”
নিয়ামতপুরের শরিফুল ইসলাম জানান,
> “আম বাগানের নিচের অব্যবহৃত জায়গায় বস্তা রেখে চাষ করছি। এতে বাগানের নিচের মাটিও রক্ষা পাচ্ছে।”
বিডিও নিয়ামতপুরের এক কর্মকর্তা জানান,
> “আমরা কৃষকদের প্রযুক্তি ও উপকরণ সরবরাহ করছি, যাতে তারা নিজেরাই টেকসই উপায়ে উৎপাদন বাড়াতে পারেন।”
উপসংহার
নওগাঁর গ্রামীণ অর্থনীতিতে বস্তায় আদা চাষ এখন এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত।
এটি শুধু পতিত জমির সুষ্ঠু ব্যবহার নয়, বরং ক্ষুদ্র কৃষকদের আত্মনির্ভরশীলতার পথ তৈরি করছে।
সরকারি সহায়তা, কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ ও বাজার সংযোগ বৃদ্ধি পেলে নওগাঁ হতে পারে দেশের আদা উৎপাদনের অন্যতম শীর্ষ জেলা।
মন্তব্য করুন