মোঃ রাতুল হাসান লিমন
ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সন্ধ্যার পর মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে সংঘবদ্ধ অপরাধীদের দৌরাত্ম্যে যাত্রী ও চালকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। একাধিক ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে।
মূল প্রতিবেদন
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে নারায়ণগঞ্জে, বিশেষ করে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের এই অংশে অপরাধের মাত্রা কয়েকগুণ বেড়েছে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো স্থানে ছিনতাই বা ডাকাতির শিকার হচ্ছেন মহাসড়ক ব্যবহারকারীরা। অনেক ক্ষেত্রে লুটপাটের পাশাপাশি হামলার ঘটনাও ঘটছে।
দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড থেকে মেঘনা টোলপ্লাজা পর্যন্ত প্রায় ২১ কিলোমিটার এলাকায় এই অপরাধ যেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। দিনের বেলায় পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকলেও সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই সংঘবদ্ধ অপরাধীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের ভাষায়, এই অংশটি এখন কার্যত অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।
অবকাঠামোগত দুর্বলতা
মহাসড়ক ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ স্থানে সড়কবাতি নেই। ফলে রাতের বেলায় পরিবহনগুলোর হেডলাইট ছাড়া পুরো সড়ক অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে। এই সুযোগেই অপরাধীরা সহজে হামলা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরার অভাবও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন মিল ও ইন্ডাস্ট্রির মালামাল পরিবহনে ব্যবহৃত বড় কন্টেইনার গাড়ি মহাসড়কে থামিয়ে রাখার কারণে প্রায়ই যানজট সৃষ্টি হয়। গাড়ি আটকে থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ডাকাত দল যাত্রী ও চালকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সর্বস্ব লুটে নেয়।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা
তথ্য অনুযায়ী, সাইনবোর্ড এলাকা, কাঁচপুর ব্রিজ ও এর নিচাংশ, মদনপুর বাসস্ট্যান্ড, লাঙ্গলবন্দ ব্রিজের আশপাশ, মোগরাপাড়া এবং মেঘনা টোলপ্লাজা এলাকায় নিয়মিত ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় নিঃস্ব হচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।
ভাইরাল ভিডিও ও সাম্প্রতিক ঘটনা
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সংঘটিত একাধিক ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
গত ২৪ ডিসেম্বর রাতে সোনারগাঁয়ের পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন এলাকা, নয়াগাঁও ও আষাঢ়িয়ারচরে পৃথক তিনটি ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ওই রাতে পূর্বাচলে আয়োজিত একটি সংবর্ধনায় যোগ দিতে যাওয়ার সময় কুমিল্লার লালমাই থানার কয়েকজন বিএনপি নেতা ডাকাতির শিকার হন। হামলায় অন্তত পাঁচজন আহত হন বলে জানা গেছে।
একই রাতে আষাঢ়িয়ারচরে আরেকটি গাড়িবহরে হামলা চালানো হয়। পরে ভোরে নয়াগাঁও এলাকায় ডাকাতির ঘটনায় আহত হন কাতারপ্রবাসী এক ব্যক্তি।
এ ছাড়া ২ জানুয়ারি রাতে সাইনবোর্ড এলাকায় প্রকাশ্যে ডাকাতির একটি ভিডিও এবং ৩ জানুয়ারি মেঘনা ব্রিজের সামনে ডাকাতির দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিও পোস্ট করে এক ইসলামী বক্তা মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের মধ্যেই লুটপাটের ঘটনার কথা তুলে ধরেন এবং প্রশাসনের অনুপস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
জনমত ও অভিযোগ
সাধারণ মানুষের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কার্যক্রমে ঘাটতি রয়েছে। অনেকের মতে, অপরাধীরা এখন আগের তুলনায় আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, ফলে মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
প্রশাসনের বক্তব্য
এ বিষয়ে কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল কাদের জিলানী জানান, মহাসড়কে নিয়মিত টহল চলছে এবং দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ২০ জনকে আটক করে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তার দাবি, শিল্পকারখানার কন্টেইনার থামানোর কারণে সৃষ্ট যানজটের সুযোগেই অপরাধীরা সক্রিয় হয়।
সোনারগাঁ থানার ওসি মহিবুল্লাহ বলেন, হাইওয়ে পুলিশের অধীনে থাকা সত্ত্বেও উপজেলা ও মহাসড়ক এলাকায় প্রতিদিন পাঁচটি টহল টিম কাজ করছে এবং নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি আবদুল বারিক জানান, তার দায়িত্বকালে থানার এলাকায় ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের মামলা হয়নি।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (খ সার্কেল) মো. ইমরান আহম্মেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
র্যাব-১১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ডাকাতি ও ছিনতাই প্রতিরোধে র্যাব সক্রিয় রয়েছে এবং নারায়ণগঞ্জে দুটি টহল টিম নিয়মিত কাজ করছে।