মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন
১৩৮ বছরের পুরোনো টাঙ্গাইল পৌরসভা আধুনিকতার ছোঁয়া পেলেও আজও গড়ে ওঠেনি কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। শহরে প্রবেশের তিনটি প্রধান পথেই রাস্তার পাশে ফেলা হচ্ছে ময়লা-আবর্জনা। দুর্গন্ধে নাক চেপে শহরে প্রবেশ করতে বাধ্য হচ্ছেন শহরবাসীসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আগত মানুষ। যেন দুর্গন্ধ দিয়েই স্বাগত জানানো হচ্ছে অতিথিদের।
শহরের বেবিস্ট্যান্ড এলাকা এবং টাঙ্গাইল–ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়কের রাবনা বাইপাসের পাশেই বছরের পর বছর ফেলা হচ্ছে পৌরসভার সকল বর্জ্য। প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে ছয়টি উপজেলার মানুষ ও দেশের বিভিন্ন জেলার যাত্রীরা যাতায়াত করেন। ময়লার ভাগারের পাশেই রয়েছে অসংখ্য বাড়িঘর—দুর্গন্ধ এবং দূষণে স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
পৌরসভা সূত্র জানায়, ১৮৮৭ সালের ১ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয় টাঙ্গাইল পৌরসভা। ২৯.৪৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই পৌরসভায় ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বসবাস করেন ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৯২ জন মানুষ। কিন্তু দীর্ঘ ১৩৮ বছরে একটি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বা নির্দিষ্ট ডাম্পিং গ্রাউন্ডও তৈরি হয়নি।
দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে উত্তর দিকের রাবনা বাইপাস এলাকায় এবং দক্ষিণাংশের কাগমারি বেবিস্ট্যান্ড এলাকায় বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এছাড়া আশেকপুর এলাকাতেও একসময় ময়লা ফেলা হত—স্থানীয়দের তীব্র প্রতিবাদের মুখে তা বন্ধ হয়। শুধু গৃহস্থালি বর্জ্যই নয়, মৃত পশুও ফেলা হচ্ছে এই ভাগাড়ে, যা দুর্গন্ধকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহিনা বেগম বলেন, “এই ময়লার গন্ধে আমাদের পরিবারের শিশু ও বৃদ্ধরা নানা রোগে ভুগছে। বসবাস করাই দায় হয়ে গেছে।”
বাড়ির মালিক মাসুদ মিয়া বলেন, “ময়লার দুর্গন্ধে ভাড়াটিয়া পাই না। নিজেরাও থাকতে পারি না, তবু বিকল্প না থাকায় কষ্ট করে থাকতে হচ্ছে।”
শিক্ষার্থী কফিল ইসলাম বলেন, “বেবিস্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন কলেজ বাসে উঠি। দুই মিনিট দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। পৌরসভা যেন দ্রুত এই বর্জ্য অন্যত্র সরিয়ে নেয়।”
পরিবেশবিদ সোমনাথ লাহিরী জানান, খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলা পরিবেশ আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। তিনি বলেন, “পৌরসভার উৎপাদিত বর্জ্য খোলা জায়গায় ফেলা হওয়ায় বিপুল পরিমাণ মিথেন গ্যাস তৈরি হচ্ছে, যা অত্যন্ত দাহ্য এবং মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বড় ধরনের দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।”
পৌর কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার নোটিশ পাঠানো হলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে তিনি জানান।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল পৌরসভা কর্তৃপক্ষ বলেন, “আমরা জেলা প্রশাসকের কাছে নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দের জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছি। নতুন জায়গা পেলে সেখানে বর্জ্য রিসাইক্লিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এতে শহরের পরিবেশ উন্নত হবে।”
টাঙ্গাইলের মতো একটি বৃহৎ ও জনবহুল পৌর শহরে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও নগরচিত্র—সবই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত ডাম্পিং গ্রাউন্ড এবং রিসাইক্লিং ব্যবস্থা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
মন্তব্য করুন