মুশাররফ হোসেন
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ (বিউবো) অফিসে চলছে অনিয়ম ও দুর্নীতির মহোৎসব। ঘুষ, হয়রানি ও সিন্ডিকেটচক্রের দৌরাত্ম্যে সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি এখন পরিণত হয়েছে ‘দুর্নীতির দুর্গে’—অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী গ্রাহকদের।
নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মজিদের যোগদানের পর থেকে তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে এক প্রভাবশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেট। এ চক্র খোলামেলাভাবে ঘুষ বাণিজ্য ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে জিম্মি করে রেখেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ, মেরামত, নতুন সংযোগ বা বিল সংশোধন—সব ক্ষেত্রেই গ্রাহকদের গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের ঘুষ। ঘুষ না দিলে পড়তে হয় হয়রানির ফাঁদে, দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হয় মাসের পর মাস।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মিটার রিডিং ছাড়াই অতিরিক্ত বিল তৈরি ও নিরপরাধ গ্রাহকদের নামে বকেয়া বিলের মামলা দায়ের এখন নিয়মিত ঘটনা।
ইসলামপুর ইউনিয়নের গণেশপুরের বাসিন্দা জাহিদ হাসান মোহাম্মদ রুহেলকে গত ২৬ অক্টোবর পুলিশ গ্রেপ্তার করে বকেয়া বিলের মামলায়, অথচ তাঁর নামে কোনো বকেয়া বিলই ছিল না। পরে জানা যায়, প্রকৃত বকেয়া ছিল অন্য এক গ্রাহকের নামে (মিটার নং ৪৪২৭৩০৭০)। ওয়াপদার গাফিলতি ও অসৎ উদ্দেশ্যে রুহেলকে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর তাঁকে সমঝোতার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
গত ৭ নভেম্বর মন্ডলীভোগ এলাকায় ‘মিটার চেক’ করতে গিয়ে কিছু বেসরকারি কর্মচারীর অসদাচরণে স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী আবুল খয়ের থানায় অভিযোগ করলে নির্বাহী প্রকৌশলী বিষয়টি ‘রফাদফা’র চেষ্টা করেন। সাংবাদিকরা ঘটনাটি জানতে গেলে, প্রকৌশলী আব্দুল মজিদ তাদের ৪০ মিনিট অফিসের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে পরে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং পুলিশ ডেকে ভয় দেখানোরও চেষ্টা করেন। পরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেই উল্টো মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ‘লাইন মেরামত’ ও ‘নতুন সংযোগ’ প্রকল্পের বিল ওঠানোর সুযোগে প্রকৌশলী ও তাঁর ঘনিষ্ঠ ঠিকাদাররা বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করছেন। হাসনাবাদ-ইলামেরগাঁও এলাকায় ২ লাখ টাকার একটি প্রকল্পে ১ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার ভিডিওও প্রকাশ পেয়েছে। বাকি ঘুষ না দেওয়ায় প্রকল্পটি ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
এর আগে লাইন মেরামতের নামে ঘুষ বাণিজ্যে জড়িত দুজনকে সেনাবাহিনী হাতে-নাতে আটক করলেও স্থানীয় প্রভাবশালীদের তদবিরে চার্জশিটে সাক্ষী বদলানো হয়, ফলে সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি দক্ষিণ বাগবাড়ি এলাকায় ট্রান্সমিটার পরিবর্তনের জন্য ৩ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া কার্ড মিটার জালিয়াতি, বিল সংশোধনে অনিয়ম, লাইনের ত্রুটিতে মানুষ ও গবাদি পশুর মৃত্যু—সব মিলিয়ে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে জনমনে।
স্থানীয়রা বলছেন, অফিসটি এখন সিন্ডিকেটচক্রের কব্জায়। সাধারণ গ্রাহক ন্যায্য পাওনা চাইলেও মামলা ও ভয়ভীতির মুখে পড়ছেন। এমনকি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, এ ধরনের অনিয়মের কারণেই সিন্ডিকেটের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মালেককে আগে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছিল। বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মজিদও একসময় বান্দরবানে বদলি হয়েছিলেন একই অভিযোগে।
এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে গেলে নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মজিদ সাংবাদিকদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে কোনো বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।
তবে সিলেট বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদির বলেন,“সাংবাদিকদের সঙ্গে এমন আচরণ করা হলে বিষয়টি অবশ্যই খতিয়ে দেখা হবে।”
স্থানীয়রা দাবি করেছেন, দ্রুত তদন্ত করে দুর্নীতিতে জড়িত প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
মন্তব্য করুন