জীবন মানেই সংগ্রাম , বেচে থাকতে হলে জীবনের সাথে যুদ্ধ করে বেচে থাকতে হয়। হারতে রাজী নই, হেরে যাবো তো মরে যাবো।
চল্লিশোর্ধ্ব মাসুদ রানা সবাই ডাকে কুটি পতি নামে। সকালে কুলি বিকেলো সবজি বিক্রেতা রাতে নাইটগাড়। অভাব অনটনের সংসারে এক মাত্র উপার্জনশীল ব্যাক্তি।যার নুন আনতে পানতা ফুড়ায়। তিন কন্যার পিতা তিনি। পুত্র না থাকায় উপার্জনের এক মাত্র সক্ষম ব্যাক্তি তিনি।দুই কন্যাকে বিভিন্ন মানুষের কাছে হাত পেতে পাত্রস্থ করেছেন। কিস্তি ও তুলছে অনেক টাকা। ভোর হওয়ার আগেই বাড়ি থেকে বের হন। ধামরাই থানা রোড় হতে হেঁটে আসেন ইসলামপুর বাজার। আধাঘণ্টা পথ পেরিয়ে ইসলামপুর বাজার পৌঁছেই ছুটে যান দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের কাছে। সেখানে তিনি পাইকাড়ি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের কাঁচামাল কেনার সময় সহযোগিতা করেন। বিনিময়ে কিছু টাকা পান।
সূর্য ওঠার আগ পর্যন্ত এই কাজ করেন। তারপর অল্প দামের সবজি গুলো কিনে আনেন।
প্রতিদিনের মতোই তিনি কাঁচামাল নিয়ে রাস্তার পাশে বসে ছিলেন। পিচ ঢালা রাস্তায় একটি প্লাস্টিকের বস্তার ওপর দু’টি বাঁধাকপি, ৮টি লেবু, ৩ কেজির মতো বেগুন, দুই কেজি শসা, কিছু শিমের সঙ্গে পিঁয়াজ নিয়ে বসে ছিলেন। তখন কৌতুহল বসত ধামরাই প্রতিনিধির সঙ্গে কথা হয়।
তিনি সাংবাদিককে বলেন, দশ বছর আগে মির্জাপুর হতে ধামরাই চলে আসি, বাবার দেওয়া ১কাঠা জমি ছাড়া কিছুই ছিল না। বাবার মৃত্যুর পর অভাবের তাড়নায় মির্জাপুর থেকে ধামরাই আসেন। তখন থেকে তিন মেয়ে নিয়ে থাকেন। মাসে তিন হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া দিতে হয়। এছাড়াও খাওয়ার খরচ তো আছেই। সবকিছু মিলিয়ে মাস শেষে পাঁচ হাজার টাকা তার প্রয়োজন পড়ে। এসবের জোগান আসে ধামরাই দক্ষিণ পাড়া মসজিদের কাছে রাস্তার উপরে ওই কাঁচামাল বিক্রি ও নাইট গার্ডের কাজ করে।
তবে ওই কাঁচামাল কারা কিনে থাকেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার মতো অনেক মানুষ আছে যারা ওসব কিনে থাকেন। আবার কখনো বড় বাবুরাও কিনেন। কেউ হয়তো ১০ টাকার জিনিস ২০ টাকা দিয়ে থাকেন। আবার কোনোদিন বিক্রিও হয় না। তখন অল্প দামে কাউকে দিয়ে দেই। নয়তো আমি বাসাই নিয়ে সেগুলো রান্না করি। এভাবে দুঃখ কষ্টে চলে আমার জীবন। তবে দুঃখের কথা এখন সবকিছুর দাম অনেক বেশি। তাই যা উপার্যন করি এতে দিনশেষে টাকা অবশিষ্ট থাকে না। স্যার গত আমের মৌসুমে আমার ছোট মেয়ে একটা আম খাওয়ার জন্য কাদছিল। হাতে টাকা নেই তাই কিনে দিতে পারি নাই। সারারাত কেদে ছিলাম। সকাল না হতে ছুটে গেলাম ইসলামপুর কাচা মালের বাজারে, কাচা মাল বাকীতে কিনলাম। কাচা মাল বিক্রি করতে সন্ধ্যান পরে। সারদিন বাহিরে বাহিরে ঘুরলাম । বিকেল হতে না হতে কাচামাল নিয়ে বসে পড়লাম রাস্তা পাশে। প্রথম একজন ক্রেতার কাছে কিছু কাচামাল বিক্রির টাকা দিয়ে দুটি আম কিনে বাসায নিয়ে গেলাম। আমার ছোট মেয়ে আম পেয়ে কত খুশি যে হল এই বলেই কেদে ফেললেন মাসুদ রানা ওরফে কুটি পতি
তিনি সাংবাদিক কে বলেন, আমি কষ্ট করলেও আমার পরিবারকে কাজ করতে দেই না দিন রাত খাটি । বড় মেয়ে এ বছর বিয়ে দিয়েছি। আর ছোট মেয়ে পড়ে ক্লাস টুতে পড়ে । মাইয়্যা টা যদি মানুষ করতে পারি, ওরা সাদা কাগজে কালো কালি মেরে খাইতে পারবে। ওগো যদি আমাগো মতো বানাই, ওরা কী কইর্যা খাবে। আমাগোর জীবন তো এভাবেই কেটে গেলো।’ তার স্বপ্ন মেয়েরা পড়ালেখা করে ভালো কোথাও চাকরি করবে। তবে শঙ্কা করেছেন শেষ পর্যন্ত তাদের পড়ালেখা করাতে পারবেন কিনা। তবে যতদিন বেঁচে আছেন তাদের পড়ালেখা করাবেন।
এখন তিনি চেষ্টা করছেন সবজি বিক্রি করে পরিবারের আর্থিক সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি স্বাবলম্বী হতে। সব বাধাকে পেছনে ফেলে তারা নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে।
এ সময় পাশ থেকে এক কাঁচামাল বিক্রেতা বলেন, ‘প্রতিদিন এভাবেই তিনি অল্প দামে কিছু কাঁচামাল কিনেন। আবার আমাদের কাজে টুকটাক সহযোগিতা করেন। আমরাও তাকে সাহায্য করি। এভাবেই তার জীবন চলে যাচ্ছে। তিনি অনেক সংগ্রাম করে জীবিকা নির্বাহ করেন।’