আবু সায়েম
গ্রামীণ এলাকার শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ, শিক্ষা উপকরণে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিভিত্তিক শেখার সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নওগাঁর বদলগাছি উপজেলায় একটি সমন্বিত শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় গণস্বাক্ষরতা অভিযান এবং বরেন্দ্র ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (বিডিও)-এর উদ্যোগে পরিচালিত “শিক্ষা সুরক্ষা: নির্বাচিত গ্রামীণ এলাকায় কমিউনিটি-নেতৃত্বাধীন শিক্ষা উন্নয়নের উদ্যোগ” প্রকল্পের আওতায় এই কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়।
দুপুরে বদলগাছি উপজেলার কোলা ইউনিয়নের ভান্ডারপুর দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রকল্পভুক্ত বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের মাঝে মানসম্মত স্কুল ব্যাগ, শীতের পোশাক ও ল্যাপটপ বিতরণ করা হয়।
আয়োজকরা জানান, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করা এবং শীতজনিত ঝুঁকি কমিয়ে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও মনোযোগ বৃদ্ধি করা।
অনুষ্ঠানে ভান্ডারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মাঝে স্কুল ব্যাগ ও শীতের সোয়েটার বিতরণ করা হয়। পাশাপাশি ভান্ডারপুর দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও ভান্ডারপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম ও নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মাঝে মোট ৬০০টি ব্যাগ ও ৬০০টি সোয়েটার বিতরণ করা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, এই সহায়তা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়াবে এবং দরিদ্র পরিবারের উপর শিক্ষা ব্যয়ের চাপ কিছুটা হলেও কমাবে।
কেবল উপকরণ বিতরণেই সীমাবদ্ধ না থেকে প্রকল্পের আওতায় শিক্ষায় ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোলা ইউনিয়নের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষামূলকভাবে ডিজিটাল লাইব্রেরি স্থাপনের লক্ষ্যে ৭টি ল্যাপটপ বিতরণ করা হয়। আয়োজকরা মনে করছেন, এই ল্যাপটপগুলো শিক্ষার্থীদের তথ্যপ্রযুক্তি দক্ষতা উন্নয়নে সহায়ক হবে এবং অনলাইন ও মাল্টিমিডিয়াভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ তৈরি করবে, যা গ্রামীণ শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের পথে এক ধাপ এগিয়ে নেবে।
অনুষ্ঠানে খোলা ইউনিয়নের কমিউনিটি এডুকেশন ওয়াচ গ্রুপের সভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ শাহীনুর ইসলাম স্বপনের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বদলগাছি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান (ছনি)। তিনি বলেন, “শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় উপকরণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করাও মানসম্মত শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ধরনের উদ্যোগ গ্রামীণ এলাকার শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ আমিরুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে এমন সহায়তা কার্যক্রম কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ শফিকুল আলম বলেন, ডিজিটাল লাইব্রেরি ও ল্যাপটপ বিতরণ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী ও আত্মনির্ভরশীল শিক্ষায় উৎসাহিত করবে।
স্বাগত বক্তব্যে ভান্ডারপুর দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসির উদ্দিন বকুল বলেন, অনেক শিক্ষার্থী আর্থিক সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ করতে পারে না। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সেই ঘাটতি কিছুটা হলেও পূরণ হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন গণস্বাক্ষরতা অভিযানের ড. মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান এবং বরেন্দ্র ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (বিডিও)-এর নির্বাহী পরিচালক জনাব আকতার হোসেন। তাঁরা জানান, কোলা ইউনিয়নের মোট ৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষামূলকভাবে এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ফলাফল ইতিবাচক হলে ভবিষ্যতে উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নেও প্রকল্পটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগ শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা, প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করা এবং কমিউনিটি-নেতৃত্বাধীন শিক্ষা উন্নয়নের একটি কার্যকর মডেল হিসেবে কাজ করবে। গ্রামীণ শিক্ষার টেকসই উন্নয়নে এ ধরনের অংশীদারিত্বভিত্তিক প্রকল্প ভবিষ্যতে আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।