জনতার খবর রিপোর্টার
প্রকাশঃ 20-জানুয়ারী-2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে জয়পুরহাটের কুমড়ো বড়ি

মোঃ গোলাম মোরশেদ 
 

জয়পুরহাটের কুমড়ো বড়ি সুস্বাদ ও উন্নতমানের হওয়ায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যায়। শহরের শান্তিনগর তাঁতিপাড়া গ্রামের প্রায় সব নারী-পুরুষেরাই তৈরি করে কুমড়ো বড়ি। এক সময় পরিবারের প্রয়োজনে খাওয়ার জন্য বানাতো কুমড়ো বড়ি। সেটি এখন বাণ্যিজিক ভাবে তৈরি হচ্ছে কুমড়ো বড়ি। তাঁতিপাড়া গ্রামের শ্রমজীবী মানুষদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে এ কুমড়ো বড়ি। ৫/৬ মাস তৈরি হয় এই কুমড়ো বড়ি। কুমড়ো বড়ি বিক্রি করে তাদের সংসার চলে সারা বছর।

বড়ি বানানোর কারিগরদের তথ্যমতে, জয়পুরহাট শহরের তাঁতিপাড়া এই গ্রামে প্রতি মাসে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার কুমড়ো বড়ি বিক্রি হয়। কুমড়ো বড়ি উত্তরাঞ্চলের মানুষের জনপ্রিয় খাবার। মাষকলাই ও চাল কুমড়া দিয়ে তৈরি হয় এ কুমড়ো বড়ি। মূলত শীতকালেই এটি তৈরি ও খাওয়ার চলনটা বেশি। এ জেলার স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ঢাকা রাজধানী, চট্টগ্রাম সহ নওগাঁ, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, পার্বতীপুর, নীলফামারীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকাররাও এসে নিয়ে যায় এখানকার কুমড়ো বড়ি। প্রতি বছর শীত এলেই তারা তৈরি করেন কুমড়ো বড়ি। এর আগে তৈরি করতেন তাদের বাবা-দাদারা। শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখতে বাবা-দাদার এই পেশা কুমড়ো বড়ি তৈরি করে। তাঁতিপাড়া গ্রামের অধিকাংশ নারী-পুরুষই সনাতন ধর্মের। শীতকালের সময়টায় গ্রামের প্রবেশমুখ থেকেই চোখে পড়ে চাটাইয়ের ওপর সারি করে বিছানো সাদা মাষকলাইয়ের তৈরি কুমড়া বড়ি। গ্রামের ভিতরে গৃহিণীরা বাড়ির ছাদে একত্রে দল বেঁধে বা কেউ কেউ মাটিতে মাদুর পেতে বড়ি তৈরির কাজ করছেন। এ কাজে নারীদের হাতের ছোঁয়াই বেশি। তবে বাড়ির পুরুষদের ভূমিকা কম নয়। তারা যাতায় মাশকালাই ভাংগলেও বেশির ভাগই ভাংগে এখন মেশিনে। এমনকি বড়িও বানান। তাদের সাথে হাত মিলিয়ে ছোটরাও বড়ি তৈরির কাজ করে।

তাঁতিপাড়া গ্রামের মানিক চন্দ্র বলেন, এ গ্রামে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ ঘর কুমড়ো বড়ি তৈরির সঙ্গে জড়িত। প্রত্যেক বাড়ি প্রতি মাসে গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ কেজি বড়ি তৈরি করে। আশ্বিন মাস থেকে শুরু হয় এ বড়ি তৈরির কাজ। চলে চৈত্র মাস পর্যন্ত। সাংসারিক কাজের পাশাপাশি এই বড়ি তৈরি ও বিক্রি করে থাকে তারা।

বড়ি তৈরির কারিগর শ্যামলী মহন্ত জানান, শীতের এই মৌসুমে প্রতিদিন ভোর রাত থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত তারা বড়ি বানানোর কাজ করেন। প্রথমে মাসকলাই রৌদ্রে শুকিয়ে যাতায় ভেঙ্গে খোসা ছাড়িয়ে নিতে হয়। পরে প্রায় ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা মাষকলাই পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। ঢেঁকি বা শিল-পাটায় কুমড়ো বেটে নিয়ে মিশ্রণ তৈরি করতে হয়। এরপর কলাই ও চাল কুমড়া দুইটির মিশ্রণে বানানো হয় বড়ির উপকরণ। এরপর বড়িগুলো পাতলা কাপড়ে সারি করে বাঁশের মাচাতে রেখে রোদে শুকানো হয়। এতে সময় লাগে অন্তত তিন দিন। অনেকে বড়িকে শক্ত করার জন্য অল্প পরিমাণে আলো চালের আটা মেশায়।

এই গ্রামের আরেক নারী কারিগর ডলি রানী জানান, সংসারের অন্যান্য কাজের পাশাপাশি কুমড়ো বড়ি তৈরি করি। এ কুমড়ো বড়ি প্রায় ২০ বছর থেকে তৈরি করি। দৈনিক ১০ কেজি কুমড়ো বড়ি তৈরি করি। আমার স্বামী কুমড়ো বড়ি বাজারে বিক্রি করে। এ বড়ি বিক্রি করে যে আয় হয় তা দিয়ে আমাদের সংসারে আগের থেকে অনেক উন্নতি হয়েছে এবং ছেলে-মেয়েকে লেখাপড়াও করাচ্ছি।

ডলি রানীর স্বামী জানান, অন্য সব ব্যবসার মতো এতেও জিনিসপত্রের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে। গত মৌসুমে প্রায় আড়াই লাখ টাকার বড়ি বিক্রয় করেছিলেন তিনি। এবছর মাষকলাই ১৭৫/১৮০ টাকা কেজি। প্রতি পিস কুমড়া প্রকার ভেদে ৮০ টাকা থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত। কারিগররা আরো জানান, প্রত্যেক ঘরে প্রতি মাসে গড়ে ৩০০ কেজি কমুড়ো বড়ি তৈরি ও বিক্রি করে।

দুই ধরনের কুমড়ো বড়ি তৈরি হয়। একটি সাধারণ মানের। আর ভালোটি শুধু মাষকলাই দিয়ে তৈরি, দামও তার বেশি। সাধারণ বড়ি পাইকারিতে বিক্রি হয় প্রতি কেজি ৩০০ টাকায় এবং ভালোটি ৪০০ টাকা। আর খুচরা বাজারে বিক্রি হয় সাধারণ মানের বড়ি সাড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি। ভালো মানের বড়ি ৪৫০ টাকা কেজি।

কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মোঃ মেহেদী হাসান জানান, কুমড়ো বড়ি বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এবং সুস্বাদ হওয়ায় দিন দিন এর চাহিদা আরো বাড়ছে। এর সঙ্গে জড়িতদের একদিকে কর্মসংস্থান হচ্ছে অন্য দিকে গ্রামীন অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখছে তারা। জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে কুমড়ো বড়ি বিক্রি হয়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচাল এ, কে, এম সাদিকুল ইসলাম জানান, প্রতি ১০০ গ্রাম মাষকলাইতে আছে ৩৪১ মিলিগ্রাম ক্যালরি, ৯৮৩ মিলিগ্রাম পটাসিয়াম, প্রোটিন ২৫ গ্রাম, সোডিয়াম ৩৮ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম ১৩৮ মিলিগ্রাম আয়রন ৭ দশমিক ৫৭ মিলিগ্রাম।

অপরদিকে, চালকুমড়া একটি পুষ্টিকর সবজি। এতে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন, মিনারেল ও ফাইবার রয়েছে তাই চাল কুমড়ার উপকারিতা অনেক। যক্ষ্মা, কোষ্ঠকাঠিন্য ও গ্যাস্ট্রিকসহ বহু রোগের উপশম করে চাল কুমড়া। চাল কুমড়া তরকারি হিসেবে খাওয়া ছাড়াও মোরব্বা, হালুয়া, পায়েস এবং পাকা কুমড়া এবং কালাই ডাল মিশিয়ে কুমড়ো বড়ি তৈরী করেও খাওয়া হয়। সব মিলিয়ে কুমড়ো বড়ি নিঃসন্দেহে একটি সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর খাবার।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নাসিরনগরে গ্রামীণ ঐতিহ্যে জমজমাট ঘোড়াদৌড় প্রতিযোগিতা

1

ভবেরচর ওয়াজীর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে ৮৭তম বার

2

একজন দক্ষ ও মানবিক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শফিকুল ইসলাম

3

টাংগাইলের নাগরপুরে পরিবার পরিকল্পনা কর্মীদের অবস্থান কর্মসূচ

4

বেনাপোল কাস্টমসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব ঘাটতি হাজার কোট

5

সুন্দরবনের দুই মাস কাঁকড়া ধরা নিষিদ্ধ

6

গজারিয়ায় ছাত্রদলের ২৫ নেতাকর্মীর একযোগে পদত্যাগ

7

ভয়াবহ নিত্যদিনের বাস্তবতা মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা শহরে য

8

নতুন বছরে রাবিপ্রবি নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা

9

পানছড়িতে বিজিবির অভিযানে অবৈধ সেগুন কাঠ আটক

10

বরিশালে অনুষ্ঠিত হয়েছে আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির আঞ্চলিক সংলাপ

11

সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিতে লোহাগাড়ায় সাংবাদিকদের

12

নির্বাচনী প্রচারণা কাজে বাধা দেওয়ায় ফরিদপুর - ৪ এ সতন্ত্র প্

13

সরাইলের শাহবাজপুর-শাহজাদাপুর সড়কের গার্ডার ব্রিজ নির্মাণে অন

14

সারা দেশে আন্তর্জাতিক দুর্নীতি প্রতিরোধ বিরোধী দিবস পালিত

15

বাবুগঞ্জ ও বিমানবন্দর প্রেসক্লাবে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীর

16

নান্দাইলে পায়ে শিকল বাধা অবস্থায় বৃদ্ধের লাশ উদ্ধার

17

শেরপুরে মোটরসাইকেল মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১ শিশুসহ আহত ৪ জন

18

সাজেকের দুর্গম পাহাড়ে শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করলো

19

মোংলায় যৌথ অভিযানে গাঁজাসহ মাদক কারবারি আটক

20