জনতার খবর রিপোর্টার
প্রকাশঃ 17-জানুয়ারী-2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে এনটিআরসিএর হাতে প্রধান ও সহ.প্রধান নিয়োগ


মিয়া সুলেমান
ঘুষ, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব—এই তিন অশুভ চক্রে দীর্ঘদিন ধরে আবর্তিত ছিল দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ। মোটা অঙ্কের অর্থ কিংবা প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিচয়—এই দুইয়ের যেকোনো একটি ‘যোগ্যতা’ থাকলেই মিলত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ এই দুই পদ। অবশেষে সেই নিয়োগ-বাণিজ্যের অবসান ঘটাতে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ (ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি) থেকে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা প্রত্যাহার করে তা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন সংবিধিবদ্ধ সংস্থা নন-গভর্নমেন্ট টিচার্স রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড সার্টিফিকেশন অথরিটি (এনটিআরসিএ)-এর হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে।
১০০ নম্বরের পরীক্ষা, বাড়ছে স্বচ্ছতা
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক বাছাই নিশ্চিত করতে প্রচলিত ৫০ নম্বরের পরিবর্তে এখন ১০০ নম্বরের পরীক্ষা নেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ নীতিমালা-২০২৬’-এর খসড়া ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেলেই নীতিমালাটি জারি হবে এবং নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করবে এনটিআরসিএ।
নতুন নম্বর কাঠামো অনুযায়ী—
লিখিত বা বাছাই পরীক্ষায়: ৮০ নম্বর
শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদে: ১২ নম্বর
মৌখিক পরীক্ষায়: ৮ নম্বর
পরীক্ষা হবে অন্তত ছয়টি পৃথক বিষয়ের ওপর, যেখানে প্রার্থীর প্রশাসনিক দক্ষতা, একাডেমিক যোগ্যতা ও নেতৃত্বগুণ সুনির্দিষ্টভাবে যাচাই করা হবে।
নিয়োগ-বাণিজ্যের বড় খাত ছিল প্রতিষ্ঠান প্রধান পদ
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও দুর্নীতির অন্যতম বড় ক্ষেত্র ছিল শিক্ষক নিয়োগ। ২০১৫ সাল থেকে সাধারণ শিক্ষক নিয়োগ এনটিআরসিএর মাধ্যমে হওয়ায় সেখানে দুর্নীতি অনেকাংশে কমলেও প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধান পদে নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে থাকায় এসব পদে দেদার নিয়োগ-বাণিজ্য চলছিল।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানভেদে এসব লোভনীয় পদের জন্য ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হতো। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর না পেয়েও নিয়োগ পাওয়ার নজির ছিল অসংখ্য। কোথাও কোথাও নিয়োগ বোর্ড বসার আগেই ফল নির্ধারণ হয়ে যেত। এমনকি অনিয়মের অভিযোগে কোনো কোনো নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত হলেও পরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে তা কার্যকর করা হয়েছে।
এখন সবই এনটিআরসিএর নিয়ন্ত্রণে
নতুন নীতিমালার আওতায়—
সব পরীক্ষা গ্রহণ
ফল প্রকাশ
চূড়ান্ত সুপারিশ
সবকিছুই করবে এনটিআরসিএ। একবার সুপারিশ হলে তা পরিবর্তনের কোনো সুযোগ থাকবে না।
শূন্য পদের তালিকা যাচাই শেষে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। প্রার্থীদের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় ন্যূনতম ৫০ শতাংশ নম্বর পেতে হবে। পদভিত্তিক শূন্য পদের তিন গুণ প্রার্থী মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হবেন। পরে লিখিত, বাছাই, সনদ ও মৌখিক পরীক্ষার মোট নম্বরের ভিত্তিতে ১.১০ অনুপাতে মেধাক্রম তালিকা প্রস্তুত করা হবে। পাশাপাশি সমসংখ্যক প্রার্থীর একটি প্যানেল তৈরি করা হবে।
একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পছন্দ হিসেবে দিতে পারবেন। নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীকে সংশ্লিষ্ট ম্যানেজিং কমিটি এক মাসের মধ্যে নিয়োগপত্র দিতে বাধ্য থাকবে। কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকলে তিনি নিয়োগে অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।
শূন্য পদের চিত্র
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ইএমআইএস সেলের তথ্য অনুযায়ী—
সারা দেশে ১০ হাজারের বেশি প্রধান ও সহকারী প্রধান পদ শূন্য
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক শূন্য: ৩,৯২০টি
সহকারী প্রধান শিক্ষক শূন্য: ৩,৮৭০টি
নিম্নমাধ্যমিকে প্রধান শিক্ষক শূন্য: ৫০৪টি
স্নাতক (পাস) কলেজে অধ্যক্ষ শূন্য: ৫৮২টি
উপাধ্যক্ষ শূন্য: ৬২৭টি
উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে অধ্যক্ষ শূন্য: ৭৬৭টি
মাদ্রাসায় শূন্য পদ: ৪৪৩টি
দেশে বর্তমানে মোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৩৪ হাজার ১১০টি, যার মধ্যে এমপিওভুক্ত ২৭ হাজার ২৮টি।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মিজানুর রহমান বলেন,
“নতুন শর্তগুলো বাস্তবায়ন হলে নিয়োগে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং মেধাবীরা সুযোগ পাবেন। নীতিমালাটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, শিগগিরই জারি হবে।”
এনটিআরসিএ চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম বলেন,
“নীতিমালার অনুমোদন মিলেছে। খুব শিগগিরই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। এই পদ্ধতিতে নিয়োগ হলে দুর্নীতির সুযোগ থাকবে না।”
নাগরিক প্রত্যাশা
সুনাগরিকদের মতে, অতীতের বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগ বাতিল করে বা অবসরে পাঠিয়ে এই সংস্কার বাস্তবায়ন করা হলে শিক্ষা ব্যবস্থায় শুদ্ধতা ও আস্থা ফিরবে। নতুন এই উদ্যোগকে তারা সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

গফরগাঁওয়ে দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ-গুলি-আহত-১০

1

দৌলতপুরে ৫৪তম জাতীয় সমবায় দিবস পালিত

2

বড়দিন ও টানা তিন দিনের ছুটিতে পর্যটনকেন্দ্রে উপচে পড়া ভিড়

3

নবাবগঞ্জে খেজুরের রস সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত গাছি

4

সাংবাদিক তুহিন হত্যায় মুখে কালো কাপড় বেঁধে পাংশায় শোক র‌্যাল

5

ইউপি সদস্যের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার

6

নওগাঁর দলগাছীতে ইউএনও’র ‘টাকা ছাড়া মিডিয়া কাভার হয় না’ মন্তব

7

ফুলবাড়িতে ২৯ বিজিবি অভিযানে ২ লাখ ৪১ হাজার টাকার মাদক উদ্ধা

8

অপরাধ কার্যক্রম রোধে তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহয়তার করার আহ্বান কে

9

গোয়ালন্দে যুবলীগের সভাপতি ও কৃষক লীগের সদস্য সচিব গ্রেপ্তার

10

ভাঙ্গুড়ায় ডাকাতি ঠেকাতে বাঁশের বেড়িকেট ভরসা

11

পোরশায় বাক প্রতিবন্ধী এক যুবক নিখোঁজ

12

ভারতের ইসলামী চিন্তাবিদ বক্তা হাফেজ ক্বারী মাওলানা ইয়াছিন বর

13

নারীরা কখনো জামায়াতের প্রধান হতে পারবেন না

14

লক্ষীপুর ২ আসনে জামাতের মনোনয়ন দাখিল

15

পানছড়ির কচুছড়ি সীমান্তে বিজিবির অভিযানে বিপুল পরিমাণ ভারতীয়

16

বাঞ্ছারামপুরে উলামা ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে ইসলামি মহাসম্মেলন

17

ধোবাউড়ায় কৃষি প্রণোদনার লটারিতে অনিয়মের অভিযোগ

18

নরসিংদীতে ২ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার

19

কারওয়ান বাজারে ব্যবসায়ী-চাঁদাবাজ সংঘর্ষ: পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ

20