মোঃ মশিউর রহমান
দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, বর্তমানে ভয়াবহ অচলাবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত এক মাস ধরে কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে। যান্ত্রিক ত্রুটি, দুর্নীতি ও মেরামতের কাজে গাফিলতির কারণে দেশের উত্তরাঞ্চলে মারাত্মক লোডশেডিং দেখা দিয়েছে, যা শিল্প উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
কেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বয়লার ও টারবাইন সিস্টেমে জটিল যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়ে। এই ত্রুটি মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে, ফলে মেরামত কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিদেশি প্রযুক্তিবিদদের সহায়তায় কাজ চলছে, তবে মেরামত সম্পন্ন হতে আরও সময় লাগবে।
দুর্নীতি ও গাফিলতিতে মেরামত বিলম্বিত
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, প্রতি বছর বিপুল অঙ্কের অর্থ মেরামত খাতে ব্যয় দেখানো হলেও কাজের মান ও গতি অত্যন্ত নিম্নমানের। তাদের দাবি, কর্মকর্তাদের গাফিলতি ও দুর্নীতির কারণেই কেন্দ্রটি আজ ধ্বংসের মুখে। তারা দ্রুত মেরামত সম্পন্ন করে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক করার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রকৌশলীরা জানান, প্রথম ও তৃতীয় ইউনিট দুটি প্রায়ই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় ইউনিটটি ২০১৮ সাল থেকেই অচল অবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে তিনটি ইউনিটের কোনোটিই কার্যক্ষম নয়, ফলে জাতীয় গ্রিডে বড়পুকুরিয়া থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ।
অর্থব্যয় বাড়ছে, উৎপাদন শূন্য
প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১২৫ মেগাওয়াট হলেও ত্রুটির কারণে উৎপাদন নেমে আসে মাত্র ৫০ মেগাওয়াটে। তৃতীয় ইউনিটে ২৭৫ মেগাওয়াটের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন হয় মাত্র ৬০–৭০ মেগাওয়াট। বর্তমানে উভয় ইউনিটই বন্ধ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রকৌশলী জানান, শুধুমাত্র তৃতীয় ইউনিটটি মেরামত করতে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। এর আগে কেন্দ্রটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেছিল চীনা কোম্পানি সিএমসি, এসএমএম এবং হারবিন। প্রতি বছর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও উৎপাদন বাড়ছে না, বরং ব্যয়ের খাত ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
চীনা কোম্পানির উপর নির্ভরতা ও সরকারের নীরবতা
কেন্দ্রটির সব ইউনিটই চীনা কোম্পানির কারিগরি সহায়তায় নির্মিত ও রক্ষণাবেক্ষিত। ফলে মেরামতের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে চীনা কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয়দের প্রশ্ন, এই নির্ভরতা ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে কেন দেশের কোটি কোটি টাকার সম্পদ আজ অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকবে?
জ্বালানি মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি। কেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তাদের অনেকে দাবি করছেন, মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণেই সমস্যার সমাধান বিলম্বিত হচ্ছে।
উত্তরাঞ্চলে বিপর্যয়
বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উত্তরাঞ্চলের প্রায় ৮টি জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। উৎপাদন বন্ধ থাকায় এসব এলাকায় লোডশেডিং ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিদ্যুৎনির্ভর শিল্প কারখানাগুলিতে দৈনিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতি।
প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্য
কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী জানিয়েছেন, “ত্রুটির কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় কাজ চলছে। তবে যন্ত্রাংশ আমদানির জটিলতার কারণে কিছুটা সময় লাগবে।”
উপসংহার
বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। কিন্তু ধারাবাহিক দুর্নীতি, গাফিলতি ও বিদেশি কোম্পানির ওপর অতিনির্ভরতার কারণে এই কেন্দ্রটি এখন ধ্বংসের মুখে। স্থানীয়দের দাবি, সরকার যেন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন পুনরায় চালু করে এবং দুর্নীতির দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
মন্তব্য করুন