আবু সায়েম৩৫ ফুট মাটির গভীরে শিশু সাজিদের বাঁচার লড়াই — সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ করছে উদ্ধারকারী দল রাজশাহীর তানোর উপজেলার কোয়েলহাট পূর্বপাড়া গ্রামের এক শান্ত দুপুর মুহূর্তেই পরিণত হলো আতঙ্কের দৃশ্যে। বুধবার বেলা একটার দিকে গ্রামের মাঠে খেলতে খেলতে দুই বছরের শিশু সাজিদ হঠাৎ করেই ৩০–৩৫ ফুট গভীর একটি গর্তে পড়ে যায়। মায়ের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনা মুহূর্তেই গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে দেয় শোক ও উদ্বেগের ছায়া।
ঘটনার বিবরণ: খড়ের নিচে লুকিয়ে থাকা মৃত্যুফাঁদ
শিশু সাজিদ তার মা রুনা খাতুনের পাশে হাঁটছিল। গর্তটি ছিল খড় দিয়ে ছাওয়া, যা দেখে কেউই বুঝতে পারেনি ভেতরে রয়েছে গভীর এক ফাঁদ। হঠাৎ সাজিদ ‘মা’ বলে ডাকলে রুনা পেছন ফিরে দেখেন—শিশুটি নেই। পরমুহূর্তেই গর্তের ভেতর থেকে ক্ষীণ স্বরে ভেসে আসে—“মা, মা…”।
মা রুনা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
“হাঁটার সময় ছেলে ডেকে উঠল। পেছনে তাকিয়েই দেখি সে নেই। গর্তের ভেতর থেকেই ডাকছিল। তারপর আর কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি।”
রুদ্ধশ্বাস উদ্ধার অভিযান: অক্সিজেন সরবরাহ ও খনন কাজ অব্যাহত
বেলা আড়াইটায় ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ততক্ষণে স্থানীয়রা আতঙ্কে গর্তের মুখে কিছু মাটি ফেলায় শিশুর সাড়া ক্ষীণ হয়ে আসে।
ফায়ার সার্ভিসের রাজশাহী বিভাগের সহকারী পরিচালক দিদারুল আলম জানান—
“বিকেল চারটা পর্যন্ত শিশুটির ক্ষীণ সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল। পরে ভিড় ও শব্দের কারণে আর কোনো শব্দ পাওয়া যায়নি। আমরা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ চালাচ্ছি।”
উদ্ধারকারীদের প্রধান দায়িত্ব এখন—
গর্তে অবিরাম অক্সিজেন সরবরাহ চালু রাখা,
শিশুটিকে অক্ষত অবস্থায় বের করতে পাশেই সমান্তরাল গর্ত খনন করা।
বিকেল সাড়ে পাঁচটা থেকে এক্সকাভেটর দিয়ে পাশে নতুন গর্ত খোঁড়া শুরু হয়। রাত পৌনে আটটা পর্যন্ত প্রায় ১০–১২ ফুট খনন কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
মাটি সরাতে ব্যবহার করা হচ্ছে দুটি ট্রাক্টর, এবং তিনটি ফায়ার সার্ভিস ইউনিট মাঠে রয়েছে।
কর্মকর্তাদের ধারণা, শিশুটির কাছে পৌঁছতে আরও কয়েক ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।
জলস্তর সংকট ও গর্তের উৎপত্তি
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ওই এলাকায় গভীর নলকূপ বসানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
পানির স্তর যাচাই করতে এক ব্যক্তি গর্তটি খনন করেছিলেন। পরে সেটি ভরাট করা হলেও বর্ষায় মাটি বসে গিয়ে পুনরায় গভীর ফাটল সৃষ্টি হয়।
সেই অদৃশ্য ফাটলেই পড়ে যায় শিশু সাজিদ।
গ্রামজুড়ে উদ্বেগ—চোখ একটাই গর্তের দিকে
ঘটনাস্থলে শত শত মানুষের ঢল নেমেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তানোর থানার ওসি মো. শাহীনুজ্জামান এলাকা ঘিরে রেখেছেন। তবু মানুষের দৃষ্টি কেবল সেই সরু গর্তে—যেখান থেকে একটি ক্ষুদ্র প্রাণ ফিরে আসার অপেক্ষা করছে পুরো গ্রাম।
এদিকে সাজিদের বাবা রাকিব, যিনি ঢাকার একটি জুটমিলে ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত, বাড়িতে ফেরার পথে শুধু প্রার্থনাই করছেন—তার ছেলেকে যেন জীবিত অবস্থায় দেখতে পান।
শেষ আশার আলো
সময় যত গড়াচ্ছে, উদ্বেগও তত বাড়ছে। তবে আশার আলো এখনও জ্বলছে—
উদ্ধার দল বিশ্বাস করছে সাজিদকে অক্ষত অবস্থায় বের করে আনা সম্ভব।
পুরো গ্রাম, উদ্ধারকারী দল, পরিবার—সবার চোখ এখন একটাই প্রশ্নে স্থির:
“সাজিদ বাঁচবে তো?”
প্রতিটি মিনিট এখন একেকটি প্রার্থনার মতো।