আবু সায়েম
নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় গভীর রাতের আঁধারে সংঘটিত এক ভয়াবহ নাশকতায় ৬ শতাধিক উন্নত জাতের আমগাছ ও মেহগনি গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। এতে দুই বছরের শ্রম, স্বপ্ন ও বিনিয়োগ হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন বাগান মালিক বজলুর রহমান নঈম।
ঘটনাটি স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
ঘটনাস্থলের চিত্র: নিঃশব্দ ধ্বংসযজ্ঞ:
শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর ২০২৫) দিবাগত রাতে উপজেলার সদর ইউনিয়নের নেহেন্দা মৌজায় অবস্থিত আমবাগানে এ ঘটনা ঘটে। সরেজমিনে দেখা যায়, সারি সারি আমগাছ গোড়া থেকে কাটা অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ডালপালা ও পাতার স্তূপ। অনেক গাছে তখনও ঝুলছিল নতুন মুকুলের কুঁড়ি—যা আসন্ন মৌসুমে ফলনের আশা জাগাচ্ছিল। কিন্তু এক রাতেই সেই সম্ভাবনা নির্মমভাবে শেষ করে দেয় দুর্বৃত্তরা।
কৃষকের কান্না: “সব শেষ হয়ে গেল”
ক্ষতিগ্রস্ত বাগান মালিক বজলুর রহমান নঈম জানান, প্রায় দুই বছর আগে তিনি নেহেন্দা মৌজায় সাড়ে ২০০ শতক জমিতে ৬ শতাধিক উন্নত জাতের আমগাছ ও কিছু মেহগনি গাছ রোপণ করেন। বাগানে বারোমাসি, কাটিমন, আম্রপালি, হাঁড়িভাঙ্গা, গৌড়মতি ও বারি-৪ জাতের আমগাছ ছিল।
তিনি বলেন,
“দিন-রাত কষ্ট করে গাছগুলো বড় করেছি। নিয়মিত সেচ, সার আর রোগবালাই দমনে কোনো ত্রুটি রাখিনি। এ বছর অনেক গাছে মুকুল এসেছে। ভেবেছিলাম ফল বিক্রি করে পরিবারের অবস্থার একটু উন্নতি হবে। কিন্তু এক রাতেই সব শেষ হয়ে গেল।”
তার হিসাব অনুযায়ী, গাছ রোপণ, পরিচর্যা, শ্রম ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে অন্তত ৮ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তবে তার ভাষায়, “টাকার ক্ষতির চেয়েও বড় ক্ষতি হলো—ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা আর আত্মবিশ্বাস হারানো।”
পরিকল্পিত অপরাধ? উঠছে প্রশ্ন
স্থানীয়দের মতে, এত বিপুল সংখ্যক গাছ কাটা হঠাৎ বা একক কোনো ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। এটি পরিকল্পিত ও সংঘবদ্ধ নাশকতা বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এলাকাটি তুলনামূলক নিরিবিলি হওয়ায় গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা নির্বিঘ্নে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পেরেছে বলে মনে করছেন তারা।
এক স্থানীয় কৃষক বলেন,
“গাছের সঙ্গে কারও ব্যক্তিগত শত্রুতা থাকতে পারে না। এটা শুধু একজন কৃষকের ক্ষতি নয়—পুরো এলাকার কৃষি ব্যবস্থার ওপর আঘাত।”
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনার পরপরই এলাকাবাসী দ্রুত তদন্ত, দোষীদের শনাক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। তবে এ ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়নি।
এ বিষয়ে নিয়ামতপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন,
“এখনও কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—এত বড় একটি ঘটনার পরও অভিযোগ না থাকায় প্রশাসনের তৎপরতা কি যথেষ্ট? কৃষকরা অভিযোগ করছেন, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এ ধরনের নাশকতা আরও বাড়তে পারে।
কৃষি ও কৃষকের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনা শুধু একজন কৃষককে নয়, পুরো অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন ও বিনিয়োগ পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলে। নিরাপত্তাহীনতায় কৃষকরা যদি বাগান বা দীর্ঘমেয়াদি ফসল চাষে আগ্রহ হারান, তবে এর প্রভাব পড়বে স্থানীয় অর্থনীতিতেও।
দাবি ও প্রত্যাশা
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও এলাকাবাসীর দাবি—
দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন
ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতার
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য সরকারি সহায়তা
কৃষি বাগান ও ফসলি জমির নিরাপত্তা জোরদার
এই নির্মম ঘটনা আবারও প্রমাণ করে, কৃষকের ঘাম ঝরানো স্বপ্ন কতটা অনিরাপদ। এখন দেখার বিষয়—এই কান্না কি তদন্ত ও ন্যায়বিচারে রূপ নেবে, নাকি আরও একটি ঘটনা হিসেবেই হারিয়ে যাবে নথির পাতায়।
মন্তব্য করুন