জনতার খবর রিপোর্টার
প্রকাশঃ 8-নভেম্বর-2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

ভয়াবহ নিত্যদিনের বাস্তবতা মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা শহরে যানজট

আলী হোসেন রাজন  

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা শহরে যানজট এখন আর কোনো সাময়িক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি এক ভয়াবহ নিত্যদিনের বাস্তবতা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কুলাউড়া বাজার, চৌমুহনী, স্টেশন রোড, থানা রোড, উপজেলা রোড এবং হাসপাতাল এলাকার রাস্তাগুলো কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। যানজটের এই স্থবিরতা কেবল সময়ের অপচয় নয়, বরং এটি শহরের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও নাগরিক জীবনের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
‎পৌরসভা ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে ট্র্যাফিক অভিযান, মোবাইল কোর্ট ও উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও এর প্রভাব থাকে খুবই অল্প সময়ের জন্য। স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘অ্যাকশন’ শেষ হতেই শুরু হয় ‘রিল্যাক্স’, আর শহর ফিরে যায় আগের বিশৃঙ্খলায়। একজন পথচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যতদিন অভিযান চলে ততদিন শৃঙ্খলা থাকে, অভিযান শেষ মানেই আবার বিশৃঙ্খলা।” এ অবস্থার কারণে শহরটি যেন এক দুষ্টচক্রের মধ্যে আটকে পড়েছে।

‎সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কুলাউড়ার ফুটপাতগুলো এখন পথচারীদের হাঁটার জায়গা নয়, বরং দোকানপাট ও পণ্য রাখার গুদামে পরিণত হয়েছে। কুলাউড়া থানার সম্মুখে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাতেও ফুটপাত দখলমুক্ত নয়। ফলে পথচারীরা বাধ্য হয়ে মূল সড়কে হাঁটেন, যা যানবাহনের চলাচলে আরও জট তৈরি করছে। অপরদিকে, রাস্তার পাশে যত্রতত্র পার্কিং ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও সিএনজির বেপরোয়া চলাচল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
‎ট্র্যাফিক বিভাগের সীমিত জনবলও এই সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলছে। জানা গেছে, মাত্র চারজন ট্র্যাফিক সদস্য দিয়ে পুরো কুলাউড়া শহরের যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ক্রমবর্ধমান যানবাহনের সংখ্যা সামলানো তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

আধুনিক ট্র্যাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা না থাকায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণে আনা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কুলাউড়া থানার ট্রাফিক সাব-ইন্সপেক্টর সুপ্রিয় বলেন, “আমাদের জনবল খুবই সীমিত, মাত্র চারজন সদস্য দিয়ে সারা শহরের ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। তবুও আমরা নিয়মিত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি এবং অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য আরও জনবল, আধুনিক সরঞ্জাম এবং নাগরিকদের সহযোগিতা দরকার। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা চেষ্টা করছি, কিন্তু সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মোঃ মহিউদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। অফিসে গেলে ‘স্যার ট্রেনিংয়ে’ বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। মুঠোফোনে এক ডজন কল দিয়েও তিনি রিসিভ করেননি।

‎যানজটের কারণে শহরের অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে পড়ছে বহুমাত্রিক প্রভাব। কর্মজীবী মানুষ সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারছেন না, ব্যবসায়িক পণ্য পরিবহনে বিলম্ব ঘটছে, শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে দেরিতে পৌঁছাচ্ছে—এতে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা কমছে। স্থানীয় এক শিক্ষার্থী নিহা চৌধুরী জনবাণী-কে বলেন, “প্রতিদিন সকালে কলেজে যাওয়ার জন্য রিক্সাতে উঠলেই যানজটে আটকে পড়ি। ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই দেরি হয়ে যায়, এতে পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাচ্ছে এবং পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সমস্যা হচ্ছে। প্রশাসনের উচিত এই সমস্যা দ্রুত সমাধান করা, নইলে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত নষ্ট হয়ে যাবে।”
‎আরও ভয়াবহ দিক হলো, জরুরি রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স যানজটে আটকে পড়ছে, যা অনেক সময় রোগীর জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য গড়ে দিচ্ছে। অপরদিকে, যানবাহনের অতিরিক্ত হর্ন ও ধোঁয়ার কারণে শহরের বায়ুদূষণ এবং শব্দদূষণ বাড়ছে, যা নাগরিকদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। একজন বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা আহসান আলী বলেন, “যানজটের কারণে প্রতিদিন অফিসে পৌঁছাতে দেরি হয়, ক্লায়েন্টদের সাথে মিটিং মিস হয়ে যায়। এতে ব্যাংকের লেনদেনে বিলম্ব ঘটে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। শহরের ব্যবসায়িক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, প্রশাসনকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে এই সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান হয়।”
‎এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট থেকে উত্তরণে প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনা, যা শুধু অভিযানে সীমাবদ্ধ না থেকে নাগরিকদের সচেতনতা ও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করবে।
‎স্থায়ী সমাধানের জন্য করণীয় পদক্ষেপগুলো হলো: প্রথমত, শহরের সব ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করে পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকারদের বিকল্প স্থানে বসার ব্যবস্থা করে মানবিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, শহরের মূল এলাকার বাইরে বা উপযুক্ত স্থানে নির্দিষ্ট পার্কিং জোন গড়ে তুলতে হবে, যাতে যত্রতত্র পার্কিং বন্ধ করা যায়। অবৈধ পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, ট্র্যাফিক বিভাগে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ, আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু এবং প্রয়োজনে একমুখী (One-Way) ট্র্যাফিক চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। চতুর্থত, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। স্কুল, কলেজ ও গণপরিবহন চালকদের মধ্যে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো দরকার। পঞ্চমত, সংকীর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা সংস্কার, বিকল্প সড়ক নির্মাণ এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্র্যাফিক আইল্যান্ড স্থাপন করতে হবে। সবশেষে, নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে অভিযান শেষ হলেই বিশৃঙ্খলা ফিরে না আসে।
‎স্থানীয় নাগরিকদের বক্তব্য, “শহরটা আমাদের, তাই দায়িত্বও আমাদের।” কুলাউড়ার যানজট সমস্যা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি সামাজিক দায়িত্ববোধেরও প্রতিফলন। তাই প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা, প্রশাসনিক কঠোরতা ও সমন্বিত উদ্যোগ। এখনই সময়, কুলাউড়াকে একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল শহরে রূপান্তরিত করার বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার।


মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কো-অপারেটিভ প্রেসক্লাব ময়মনসিংহ জেলার শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক ম

1

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী থানায় ওপেন হাউজ ডে অনুষ্ঠিত

2

আবারও নিষিদ্ধ অ্যাথলেট জহির রায়হান

3

সংস্কার হলো নির্বাচন পেছানোর বাহানা: জি এম কাদের

4

দিনাজপুরে কাজী বোরহান স্মৃতি ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতা ২০২৬-এর

5

*নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে বৃদ্ধাকে গলাকেটে হত্যা; র‌্যাবের যৌথ

6

পাবনায় তথ্য গোপন করে নিজ জেলায় চাকরির অভিযোগ

7

মঠবাড়িয়ায় সেনাবাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানে ৩ জন আটক

8

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় ত্রয়োদশ নির্বাচন উপলক্ষে অতিরিক্ত বিভাগ

9

হোসেনপুর-গফরগাঁও মহাসড়কে ভয়াবহ দুর্ঘটনা

10

বগুড়ায় তারেক রহমানের পক্ষে ছাত্রদলের গণসংযোগ ও প্রচারণা মিছি

11

বগুড়া দুমাসের সংসারের এক ঝলমলে সকাল ও নিথর দুপুরের করুণ কাহি

12

মণিরামপুরে কৃষকের ফল ধরন অবস্থায় পেঁপে ও কলা গাছ কেটে ফেলার

13

কাদামাটি দিয়ে সড়ক সোল্ডার, অভিযোগ এলাকাবাসীর

14

নাসিরনগরে জামিয়া মতিনিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসার ১১তম সালান

15

আমীরে জামায়াতের জনসভা উপলক্ষে চাঁপাইনবাবগঞ্জে জামায়াতের সাংব

16

সুনামগঞ্জে নতুন জেলা পুলিশ সুপার দায়িত্ব গ্রহন করেন।

17

গুইমারা উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত

18

রাবিপ্রবির নতুন প্রক্টর ড. মোঃ ফখরুদ্দিন

19

ঝিনাইদহে কৃষকের ছদ্ম বেশে দু’ডাকাত আটক

20