মোঃ জাকি উল্লাহ
প্রকাশঃ 15-মে-2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

রায়গঞ্জে আয়নাঘরের রহস্য উদ্ঘাটন বিয়ে পাগল বৃদ্ধের জমি লিখে নেয়া ছিল মূল লক্ষ্য

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে সোনারাম গ্রামের আলোচিত সেই কথিত আয়নাঘরের রহস্য উদঘাটন করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।  
গুপ্তঘরের মালিক সুমনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সুমন ঘটনার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে গ্রাম্য চিকিৎসক নাজমুল হোসেন আরাফাতের নাম উল্লেখ করেছেন।
বৃদ্ধ আব্দুল জুব্বার (৭৫) ও শিল্পী খাতুনকে (৩৮) আরাফাত তার ভাড়া নেওয়া ঘরে দুই মাস আটকে রেখেছিলেন দাবি করলেও আয়নাঘর বলতে কিছু ছিল না বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন সুমন।  
মঙ্গলবার (১৩ মে) সন্ধ্যায় সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. আলমগীর হোসেনের আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন সুমন। তিনি রায়গঞ্জ উপজেলার চান্দাইকোনা ইউনিয়নের সোনারাম গ্রামের জহুরুল ইসলামের ছেলে। নাজমুল হোসেন আরাফাত একই ইউনিয়নের পূর্ব লক্ষ্মীকোলা গ্রামের মৃত রেজাউল করিম তালুকদারের ছেলে।
ভিকটিম আব্দুল জুব্বার উপজেলার পূর্ব পাইকড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং শিল্পী খাতুন লক্ষ্মী বিষ্ণুপ্রসাদ গ্রামের মনসুর আলীর স্ত্রী।  
সিরাজগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ডিবির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা( ওসি) একরামুল হোসাইন বলেন, সুমনের জবানবন্দি এবং সেটা যাচাই-বাছাই করে আয়নাঘর বলতে কিছু পাওয়া যায়নি। ওই নারী এবং বৃদ্ধকে নির্যাতনের চিহ্নও মেলেনি। মূলত বৃদ্ধ আব্দুল জুব্বার একজন বিয়ে পাগল মানুষ। প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি আরও তিনটি বিয়ে করেছেন। তবে তার ছেলে-মেয়েরা পর্যায়ক্রমে তিনটি স্ত্রীকেই অত্যাচার করে তাড়িয়ে দিয়েছেন। বৃদ্ধের নিজের নামে ৮ বিঘা জমি রয়েছে। তার জমি হাতিয়ে নেওয়ার জন্য শিল্পী খাতুন নামে ওই নারীর সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার কথা বলে তাদের দুমাস আটকে রাখেন মাস্টারমাইন্ড আরাফাত।  
তিনি আরও বলেন, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সুমন জানিয়েছেন, প্রায় এক বছর আগে দুর্ঘটনায় তার বাবা জহুরুল ইসলামের পায়ের তিনটি আঙুল কেটে ফেলতে হয়। সেই কাটা আঙুলে পচন ধরে। তার চিকিৎসার সূত্র ধরেই গ্রাম্য ডাক্তার নাজমুল হোসেন আরাফাতের সঙ্গে পরিচয় এবং সম্পর্ক হয় সুমনের। আরাফাতের এক ভাই চিকিৎসক, তার পরামর্শেই জহুরুলের চিকিৎসা করেন তিনি। এতে জহুরুলের পা ভালো হয়ে যায়।  
সম্পর্কের সূত্র ধরে গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবসার কথা বলে সুমনের নির্মাণাধীন ঘর ভাড়া চান আরাফাত। ঘর রেডি না হওয়ায় সুমন আরাফাতকে ঘরটি ঠিক করে নিতে বলেন। পরে আরাফাত তিন লাখ টাকা দিয়ে দুটো রুম তৈরি করে নেন। এটাচ বাথরুমের জন্য আরাফাত নিচে হাউজ করেন। ওই হাউজকেই কথিত আয়নাঘর বা গুপ্তঘর হিসেবে উল্লেখ করেন বন্দি থাকা শিল্পী ও জুব্বার।  
 সুমনের ভাষ্য অনুযায়ী গত শবে বরাতের ১০/১২ দিন আগে রাতে আব্দুল জুব্বারকে নিয়ে আসেন আরাফাত। তখন বৃদ্ধের ব্যাপারে প্রশ্ন করলে আরাফাত বলেন তাকে বিয়ে দেব। বৃদ্ধ নিজেও বিয়ের করবেন বলে স্বীকার করেন। প্রথম দু/তিনদিন বৃদ্ধকে কলা রুটি খেতে দেওয়া হয়। বিষয়টি সুমনের মা জানতে পারলে তিনি তাকে খাবার দিতে থাকেন। এর ১৪ দিন পর শিল্পী খাতুনকে নিয়ে এসে আরাফাত বলেন, বৃদ্ধের সঙ্গে এই নারীর বিয়ে দেব। বৃদ্ধ বিয়েতে রাজি হয়। দুজনে একসঙ্গেই থাকেন। তাদের ওই কক্ষটিতে বাইরে থেকে তালা দিয়ে রাখা হয়। তবে বাইরের দরজা দিয়ে দুজনেরই পালানোর সুযোগ থাকলেও তারা পালাননি। আন্ডারগ্রাউন্ড কক্ষে তাদের রাখা হয়নি। বেশ কিছুদিন থাকার পর সুমনের সঙ্গে শিল্পীর চার/পাঁচদিন শারীরিক সম্পর্ক হয়। তখন শিল্পী সুমনকে বিয়ে করতে চান। তবে বয়সের তফাৎ থাকায় সুমন বিয়ে করতে রাজি হন নাই। এর মধ্যে মমিন নামে আরেকজনকে নিয়ে আসেন আরাফাত। তারা বৃদ্ধকে বলেন, তোমার জমির কাগজপত্র নিয়ে আসো। শিল্পীকে বিয়ে করতে চাইলে তার নামে জমি লিখে দাও। বৃদ্ধ বলে, আমার কাছে এখন তো কাগজপত্র নেই।  
সুমন জবানবন্দিতে আরও বলেন, ১০/১২ দিন পর দুজনকে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিলেন আরাফাত। কিন্তু ২ মে সকালে উঠেই দেখি তারা কেউ নেই। সকালেই এলাকাবাসী এসে আমার বাড়িঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। অবস্থা বেগতিক দেখে আমি পালিয়ে যাই। আরাফাত পাওনা তিন লাখ টাকা পরিশোধ ও আরও ৫০ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিলেন, এজন্য তাকে সহযোগিতা করেছি।  
 প্রধান আসামি আরাফাতকে পুনরায় রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে, আরও বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে।  
প্রসঙ্গত, গত ২ মে ভোরে রায়গঞ্জ উপজেলার সোনারাম গ্রামে দিনমজুর সুমনের বাড়িতে নির্মাণাধীন ভবনের নিচে গুপ্তঘর থেকে মাটি খুঁড়ে সুরঙ্গ পথ তৈরি করে বেড়িয়ে আসেন বলে দাবি করেন শিল্পী খাতুন ও আব্দুল জুব্বার। তারা বলেন গুপ্তঘরে বৃদ্ধকে ৫ মাস ২৫ দিন ও শিল্পীকে ৪ মাস বন্দী রাখা হয়েছিল। এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ জনতা জহুরুলের বাড়িঘর ও গুপ্তঘর ভাঙচুর এবং আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। একই দিনে পশ্চিম লক্ষ্মীকোলা গ্রামে অভিযুক্ত নাজমুল ইসলাম আরাফাতের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। 
এ ঘটনায় শিল্পীর স্বামী মনসুর আলী ও আব্দুল জুব্বারের ছেলে শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন। এসব মামলায় ২৫ জনকে আসামি করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় প্রধান আসামি নাজমুল হোসেন আরাফাতকে। পুলিশী অনুসন্ধানে আন্ডারগ্রাউন্ড কক্ষ পাওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। তবে সেটি আয়না ঘরের মতো নয়। ১২ মে দুটি মামলার তদন্তভার জেলা গোয়েন্দা পুলিশে হস্তান্তর করা হয়। দুটি মামলা তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন এসআই নাজমুল হক রতন। সোমবার রাতে সদর উপজেলার বহুলী বাজার থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।


মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জীবন নগর শিক্ষক কর্মচারী কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিঃ এর ১

1

হবিগঞ্জ সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও

2

গোয়ালন্দ ছোট্ট ভাকলা ইউনিয়নে আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম এর পথসভ

3

ঢাবির ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়া অনন্য গাঙ্গুলীর ‘আত্মহত্যা’

4

টুঙ্গিপাড়ায় রাস্তায় আগুন

5

যশোর-১ শার্শা আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিলেন ৭ জন প্রার্থী

6

পটুয়াখালী গলাচিপায় যথাযথ মর্যাদায় পালিত মহান বিজয় দিবস

7

কাহালুর কালাই ঘোনপাড়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া

8

জামালপুরে কামালখান হাট কামিল মাদ্রাসার প্রাক্তন শিক্ষার্থীদে

9

৩ দিনব্যাপী উচ্চশিক্ষার দক্ষিণ এশীয় সম্মেলনে রাবিপ্রবি উপাচা

10

পার্বতীপুরে শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি দুর্ভোগে খেটে খাওয়া মানুষ

11

বিএনপি ক্ষমতায় গেলে আধুনিক শহর হবে নোয়াখালী

12

দিনাজপুরে সড়ক দখলমুক্ত অভিযানে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান

13

জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকীতে বরিশালে জেলা আইনজীবী ফোরা

14

মাদারীপুরে কাভার্ড ভ্যানের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দোকানে উঠে প্রাণ

15

জীবন তারেক রহমানকে যা দিয়েছে, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি কেড়ে ন

16

জামালপুরে ৫ দফা দাবীতে অটোরিক্সা চালকদের ধর্মঘট

17

রায়গঞ্জে ফেসবুক পোস্টের জেরে হামলা ও হুমকি

18

কিশোরগঞ্জে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের মনোনীত প্রার্থীর মতবিনিময়

19

হাসিনা থাকলে দেশে অন্তত একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলত// মির্

20