খ,ম,জায়েদ হোসেন
চ্যাপা শুটকি। দেশীয় মিঠা পানির পুঁটি মাছের আরেক রূপ। আবহমান বাংলার এক অনন্য খাবার উপাদান, যা ভোজন রসিকদের অতিশয় প্রিয়। তাদের রসনার স্বাদ মিটে এই চ্যাপা শুটকিতে।
প্রবাসে থাকা বাঙালিরাও দারুণ ভক্ত এই চ্যাপা শুটকির। বহু কষ্টে-শিষ্টে তারা সংগ্রহ করে থাকেন এই চ্যাপা শুটকি। আর এই সঙ্গত কারণেই চ্যাপা শুটকির কদর দেশে-বিদেশে সর্বত্রই।
নদীমাতৃক বাংলাদেশে খাল-বিল আগের মতো আর নেই। উচ্চ ফলনশীল ফসল ফলাতে কৃষকরা জমিতে ব্যবহার করছে পর্যাপ্ত পরিমাণে সার-কীটনাশক। বর্ষা মৌসুমে এসবের বিষক্রিয়া পানিতে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। তাছাড়া এসবের প্রভাবে দেশীয় প্রজাতির মাছের আধার-বীজতলা বিষাক্রান্ত হবার কারণে দিনকে দিন কমে যাচ্ছে মিঠা পানির মাছ। আগের মতো বিল,হাওর -বাওর নেই, তাই অনেক প্রজাতির দেশীয় মাছও আজ অনেকটাই বিলুপ্তের উপক্রম।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সর্ব উত্তরের হাওড়বেষ্ঠিত নাসিরনগর উপজেলায় আজও তৈরি হয় বাঙালির চিরচেনা চ্যাপা শুটকি। আর বর্তমানে এই জনপদে চলছে বিভিন্ন বিলের সুস্বাধু মিঠা পানির দেশীয় পুঁটি মাছের চ্যাপা শুটকি তৈরির ধুম। তবে প্রয়োজনীয় অর্থ সঙ্কটের কারণে লাভ জনক এই খাতটিও অনেকটাই থমকে দাঁড়িয়েছে।
প্রয়োজনীয় অর্থাভাবে অনেকে ছেড়েও দিয়েছেন এই চ্যাপা শুটকি তৈরির এই বংশানুক্রমিক কাজ। প্রয়োজনীয় সরকারি-বেসরকারি বরাদ্দ পেলে আবারও চাঙা হয়ে ওঠতে পারে নাসিরনগরের চ্যাপা শুটকি তৈরির বাজার।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, নাসিরনগর উপজেলা সদরের উত্তরাংশেই অবস্থিত জেলে পল্লী। এই পল্লীর ধারে-নদীর পাড়ে বাঁশের মাঁচা তৈরি করে শুকানো হয় এসব চ্যাপা শুটকি। জেলে পাড়ার মহিলারা সকাল থেকেই মাছ কাটা-কুটা ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করেন।
কার্ত্তিক-অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাসজুড়েই চলে মাছ ধরার ভরা মৌসুম। আর এসময়ে জেলে পরিবারের মহিলাদের এতটুকুনও থাকেনা ফুরসৎ। সারাক্ষণই তারা অতিশয় ব্যস্ত থাকেন চ্যাপা শুটকি তৈরির কাজে।
নদীর পাড়ে যেতেই দেখা মিললো বিমল দাস, সৌরভ দাস, হরিদাস, সুশীল দাস, জীবন চন্দ্র দাস, মতিলাল দাস ও অমল দাসের ছয়টি মাচায় চলছে দেশীয় পুঁটি মাছ শুকানোর মনোহর দৃশ্য।
বিলের মিঠা পানির পুঁটি মাছ দিয়েই তৈরি হয় বাঙালির অত্যন্ত প্রিয় এই চ্যাপা শুটকি। ভোজন রসিকদের রসনার স্বাদ মেটাতে এই চ্যাপা শুটকি অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে । এর নাই কোনোই বিকল্প। দেশে তৈরি এই সমস্ত চ্যাপা শুটকি দেশের বাহিরেও যায়।
এছাড়া দেশীয় মিঠা পানির মাছ শোল,
বোয়াল,টাকি,বাইম,গজার,চাপিলা,
বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শুকানোর ব্যস্ত সময় পাড় করছে জেলে পল্লীর বাসিন্দারা।
নাসিরনগর জেলে পল্লীর বাসিন্দা হিরালাল দাস জানায়, ‘দেশীয় পুঁটি মাছের দ্বারা তৈরিকৃত প্রতি কেজি চ্যাপা শুটকি সাত-আটশ’ টাকায় বিক্রি হয়। অনেক প্রবাসীরা বাংলাদেশ থেকে চ্যাপা শুটকি বিভিন্ন দেশে নিয়ে যায়। তবে বর্তমানে নাসিরনগরের বিভিন্ন হাওড় এবং বিলে মাছ ধরার ভরা মৌসুম চললেও আগের মতো তেমনটা পাওয়া যাচ্ছে না চ্যাপা শুটকি তৈরির দেশীয় মিঠা পানির পুটিঁ মাছ।’
একই এলাকার বাসিন্দা পরিমল দাস জানান, 'শুটকি তৈরির এসমস্ত পুঁটি মাছ এখন হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন হাওড় থেকে ক্রয় করে এনে চ্যাপা শুটকি তৈরির জন্য শুকানো হচ্ছে।’
চ্যাপা শুটকি তৈরির কাজে নির্মাণকৃত মাচার মালিকরা জানান, ‘প্রয়োজনীয় অর্থ সঙ্কটের কারণে শুটকি তৈরির কারিগররা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। আবহমান কালের এই ব্যবসাটিকে তারা ঠিকঠাক মতো চালিয়েই নিতে পারছেন না।
সরকার যদি চ্যাপা শুটকি তৈরির কাজে পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ বরাদ্ধ দিতেন, তাহলে অত্যন্ত লাভজনক আর চাহিদাসম্পন্ন কাজটিকে তারা আরো ভালোভাবে চালিয়ে নিতে পারতেন।
অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে ব্যবসা চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদেরকে। তাই চ্যাপা শুটকির ব্যবসায়ীরা এই খাতে সরকারি-বেসরকারি অর্থনৈতিক সহযোগিতা কামনা করছেন।
মন্তব্য করুন