জনতার খবর রিপোর্টার
প্রকাশঃ 24-নভেম্বর-2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

পদ্মা সেতুর প্রভাব যাত্রী সংকটে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরি ও লঞ্চঘাট

সাইফুর রহমান পারভেজ 
 


পদ্মা সেতু হওয়ার পর যাত্রী সংকটে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরি ও লঞ্চঘাট। এতে আয় রোজগার কমে যাওয়ায় এসব ফেরি ও লঞ্চঘাটে নিয়োজিত শ্রমিক কর্মচারীরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।


জানা গেছে ২৫ জুন ২০২২ পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল। রাজধানীতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাতায়াতে সময় ও ভোগান্তি কমেছে। কিন্তু এই উন্নয়ন আনন্দের আড়ালে দৌলতদিয়া–পাটুরিয়া ফেরি ও লঞ্চঘাটের চারপাশে জীবিকা নির্ভর হাজারো মানুষের জীবন প্রায় থমকে গেছে।


একসময় দেশের প্রধান এই নৌপথ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার প্রাণকেন্দ্র ছিল। দৌলতদিয়া ঘাটে দিনরাত  ৫–৭ কিলোমিটার দীর্ঘ যানবাহনের সারি লেগে থাকত। মহাসড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছিল স্থায়ী-অস্থায়ী হোটেল-রেস্তোরাঁ, আবাসিক হোটেল, দোকানপাট ও হকারের ভিড়। প্রতিদিন শত শত রিকশাচালক যাত্রী পরিবহনে ব্যস্ত থাকতেন, আর সহস্রাধিক হকার জীবিকা নির্বাহ করতেন লঞ্চ ও ফেরি ঘাট ঘিরে। ট্রাকচালকদের আড্ডা, যানবাহনের কোলাহল ও নদী পারাপারের তাড়া তখন ঘাটকে করে তুলেছিল দেশের অন্যতম বাণিজ্যকেন্দ্র।


কিন্তু পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন পারাপার শুরু হওয়ার পর সবকিছু এক নিমিষে বদলে যায়। পূর্বে ৭টি ফেরিঘাট দিয়ে দিনে ১৮-২০টি ছোট বড় ফেরি চলাচল করত। উভয় ঘাট মিলে প্রতিদিন অর্থাৎ ২৪ ঘন্টায় ১০ হাজার বিভিন্ন প্রকার যানবাহন নদী পারাপার হতো। এখন ফেরি গুলো অলস সময় কাঁটাচ্ছে।  মাত্র ৭-৮ টি ছোট বড় ফেরি দিয়ে দৌলতদিয়া পাটুরিয়া ঘাট সচল রাখা হয়েছে। বর্তমান ২৪ ঘন্টায় সর্বোচ্চ ৪ হাজার বিভিন্ন প্রকার যানবাহন নদী পারাপার হয়ে থাকে।


লঞ্চ ঘাটের চিত্র আরো করুন। পূর্বের সেই চিরচেনা চিত্র নেই। লঞ্চ ঘাটে যাত্রীদের কোলাহল আর চোখে পড়ে না। লাল পোশাক পরে দল বেঁধে কুলিদের দেখা মেলে না। হকারদের আনা গোনা নেই। ঘাটের চার পাশে বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসে থাকে না কোন ভাসমান দোকান।  একটি সময় দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া লঞ্চ ঘাট দিয়ে প্রতিদিন ১২-১৫ হাজার যাত্রী পারাপার হতো। পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন ও ট্রেন চলাচল শুরু হওয়ায় উভয় ঘাট মিলে এখন সর্বোচ্চ ৩ হাজার যাত্রী পারাপার হয়।


এই পরিবর্তনের প্রভাবে দৌলতদিয়া পাটুরিয়া ঘাটের দুই পাশে জৌলুশ হারিয়েছে। দৌলতদিয়া লঞ্চ ও ফেরি  ঘাট কেন্দ্রীক অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, আবাসিক হোটেল, স্থায়ী ব্যবসায়ীরা  লোকসানের কারণে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। খালি পরে রয়েছে শত শত দোকান।


স্থানীয় ব্যবসায়ী শহিদুল মিয়া বলেন, ‘আগে দিন-রাত লাখ টাকার ব্যাচা বিক্রি  হতো। এখন খরচ উঠানোই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পদ্মা সেতু দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন পূরণ করেছে ঠিকই কিন্তু আমাদের কর্মহীন করে তুলেছে।


দীর্ঘদিন চা বিক্রেতা সাকাত হোসেন বলেন, ‘আগে দিনে হাজার কাপ চা বিক্রি হতো, এখন ১০০ কাপও বিক্রি হয় না। বাধ্য হয়ে দোকান বন্ধের কথা ভাবছি।’


স্কুল শিক্ষক হাবিবুর রহমান বলেন, নতুন প্রজন্ম হয়তো কখনো কল্পনাও করতে পারবে না দৌলতদিয়া–পাটুরিয়া ঘাটের একসময়কার ব্যস্ততা ও কোলাহল। তাঁর ভাষায়, ‘এটা শুধু যাতায়াতের পথ ছিল না, বরং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র ছিল।’


প্রায় ২০ বছর যাবত দৌলতদিয়া ঘাটের সাথে কর্মরত সাদেকুর রহমান বলেন, পদ্মা সেতুতে রেল চালুর পর ফেরিঘাট আরও অচল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, লঞ্চঘাটের পুরোনো কাঠামো ভেঙে যাচ্ছে। এক সময়কার জাঁকজমকপূর্ণতা এখন পরিণত হয়েছে নির্জনতায়।

এ যেন উন্নয়নের এক ভিন্ন চিত্র সময় বাঁচল বটে, কিন্তু হারিয়ে গেল হাজার হাজার মানুষের জীবিকা। একসময়ের প্রাণবন্ত দৌলতদিয়া–পাটুরিয়া ফেরি ও লঞ্চঘাট এখন কেবল ইতিহাসের অংশ, আর স্মৃতির পাতায় রয়ে গেছে তাদের জৌলুশময় দিনগুলো।


দৌলতদিয়া লঞ্চঘাটের ম্যানেজার মো. নুরুল আনোয়ার মিলন বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালু হওয়ার আগে প্রতিদিন প্রায় ১৫ হাজার যাত্রী এই ঘাট দিয়ে লঞ্চে পদ্মা পার হতো। তখন আমাদের ২২টি লঞ্চ দিয়েও যাত্রী পারাপারে হিমশিম খেতে হতো। কিন্তু এখন প্রায় সময়ই বেশিরভাগ লঞ্চ বসে বসে অলস সময় কাটাচ্ছে।

সেতু চালুর পরও কিছুটা যাত্রী পাওয়া যেত। তবে সেতুতে রেল চলাচল শুরু হওয়ার পর থেকে ঘাট একেবারে যাত্রীশূন্য হয়ে পড়েছে। বর্তমানে এই ঘাট দিয়ে সর্বোচ্চ এক হাজার থেকে দেড় হাজার যাত্রী পারাপার হয়।’


বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌপরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া ঘাট শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. সালাউদ্দিন জানান, সেতু চালু হওয়ার আগে প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টায় শুধু দৌলতদিয়া ঘাট প্রান্ত দিয়েই ৫ হাজারেরও বেশি যানবাহন পারাপার করা হতো। তখন ঘাট এলাকায় সব সময়ই যানবাহনের দীর্ঘ সিরিয়াল থাকতো।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সবগুলো ফেরি সচল থাকলেও এখন ঘাটে গাড়ির জন্য ফেরিকে অপেক্ষা করতে হয়। ফলে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে আর আগের মতো কর্মচাঞ্চল্য নেই।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৮- দলীয় জোটের চূড়ান্ত মনোনয়ন পেলেন শরীফ আব্দুল জলিল.

1

কুড়িগ্রাম জেলায় রৌমারী সীমান্তে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর

2

বেলকুচিতে ৫৪তম জাতীয় সমবায় দিবস উপলক্ষে বর্নাঢ্য র‍্যালি ও আ

3

বামনায় যৌথবাহিনীর অভিযানে গাজা ও ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী সালমা

4

স্বৈরাচারী সরকার প্রশাসন ভেঙে দিয়েছে

5

কটিয়াদীতে অর্ধশতাধিক হাফেজ শিক্ষার্থীর মাঝে কম্বল বিতরণ

6

ত্যাগ, গ্রহণযোগ্যতা ও ঐক্যের সমীকরণে নাজমুল মোস্তফা আমিন

7

রাজবাড়ী আদালত প্রাঙ্গণে স্লোগান, ৫ জন আটক

8

নতুন সদস্যদের বরণ করে নিলো ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাব

9

বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনা দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠি

10

বামনায় জেলা প্রশাসকের সাথে উপজেলা প্রশাসনের মতবিনিময়

11

নাসির নগরে পানি সংকটে বোরো উৎপাদন ব্যাহত

12

ঈশ্বরগঞ্জে শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত

13

চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে সেনা–পুলিশের অভিযানে অস্ত্রসহ বিএনপি ন

14

ধামরাই উপজেলা নির্বাহী আফিসার সুতিপাড়া ইউনিয়নের সরকারি জমি উ

15

আজ থেকে সিলেটে রাত সাড়ে ৯ টার পর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা

16

খাগড়াছড়িতে সেনা অভিযানে মগ পার্টির প্রধান কংচাইঞো মারমা নি

17

চান্দিনায় যুবদলের ৪৭ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আনন্দ র‍্য

18

সাপাহারে খালেদা জিয়ার সুস্থতা চেয়ে বিএনপির দোয়া মাহফিল

19

আনোয়ারায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দোকানে ঢুকে পড়ল বাস: অটোরিকশা চূর্

20