জনতার খবর রিপোর্টার
প্রকাশঃ 26-অক্টোবর-2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

জয়পুরহাট-০২ আসনে বিএনপির ছয় মনোনয়ন প্রত্যাশীর মাঝে জামায়াত একক প্রার্থী, জমে উঠেছে নির্বাচনী মাঠ

তারিকুল ইসলাম 
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসতেই উত্তেজনায় কাঁপছে জয়পুরহাট-২ (কালাই, ক্ষেতলাল,আক্কেলপুর) আসনের রাজনৈতিক অঙ্গন। ভোটারদের আগ্রহ, মাঠের কর্মসূচি, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা এবং দলীয় সমীকরণ সবকিছু মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব নির্বাচনী আবহ বিরাজ করছে এ অঞ্চলে। বিএনপি এখানে ফের ঘুরে দাঁড়াতে মরিয়া। ছয়জন মনোনয়নপ্রত্যাশী একদিকে তৃণমূলের মাঠে নিজের অবস্থান শক্ত করতে প্রচারণায় ব্যস্ত, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর একক প্রার্থী এস.এম. রাশেদুল আলম সবুজ সুসংগঠিত ও লক্ষ্যভিত্তিক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন নিরন্তর।ফলে জয়পুরহাট-২ এর রাজনীতি এখন এক জটিল ও উত্তেজনাপূর্ণ সমীকরণের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে এই আসনে মোট ভোটার ৩,৩৫,৯৭০ জন। এর মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা ১,৬৯,৩৭৪ জন, যা পুরুষ ভোটারদের চেয়ে প্রায় তিন হাজার বেশি। এই নারী ভোটের আধিক্য রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশলে বড় প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বোদ্ধারা।

১৯৯১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় জয়পুরহাট-২ ছিল বিএনপির শক্ত ঘাঁটি। এ সময় অ্যাডভোকেট আবু ইউছুফ মো. খলিলুর রহমান এবং ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফার মতো নেতারা দলটির পক্ষ থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে ২০১৪ সালের পর আওয়ামী লীগের দখলে চলে যায় আসনটি।দীর্ঘ রাজনৈতিক দূরত্ব কাটিয়ে এবার আবারও জয়পুরহাট-২ পুনর্দখলের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামছে বিএনপি। বিএনপির এই ছয় মনোনয়নপ্রত্যাশী সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন এবং প্রত্যেকে নিজেকে জনগণের কাছে সবচেয়ে যোগ্য, জনদরদি ও নেতৃত্বে উপযুক্ত বলে তুলে ধরছেন।তবে এবার দলটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা।

এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফা আবারও নির্বাচনী জোর প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বুয়েট থেকে প্রকৌশল ডিগ্রি অর্জন করে পেশাগত সফলতার পাশাপাশি সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এলাকায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন। স্থানীয় সড়ক নির্মাণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংস্কার ও আধুনিকায়ন,স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ সবক্ষেত্রেই তাঁর অবদান মনে রেখেছেন অনেক ভোটার। তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক তাঁকে নির্বাচনে অন্যতম সম্ভাব্য শক্ত প্রার্থী করে তুলেছে। তাঁর ভাষায়, আমি দায়িত্ব পালন করেছি, শুধু প্রতিশ্রুতি দিইনি। মানুষের পাশে ছিলাম এবং থাকব।

অপরদিকে রাজশাহী বিভাগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এএইচএম ওবায়দুর রহমান চন্দন ১৪ বছর ধরে সংগঠনের শৃঙ্খলা ও কার্যক্রমে সক্রিয় থেকেছেন। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা এবং কর্মীবান্ধব মনোভাব তাঁকে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তুলেছে। কালাই, ক্ষেতলাল ও আক্কেলপুরের বিভিন্ন ইউনিয়নে তাঁর নেতৃত্বে বিএনপির সভা- সমাবেশ,গণসংযোগ ও রাজনৈতিক কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। এতে নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। যা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। 
সেই থেকে তিনি এলাকায় নেতাকর্মীর সঙ্গে নিয়মিতভাবে যোগাযোগ রাখছেন। নেতাকর্মীদের নিয়ে বিভিন্ন কর্মিসভা, উঠান বৈঠক, গণসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন। প্রতিদিন কোনো না কোনো কর্মিসভা ও পথসভায় নিয়মিতভাবে অংশগ্রহণ করছেন। দলের ৩১ দফা কর্মসূচি নিয়ে নেতাকর্মীদের মাধ্যমে নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।তিনি বলেন,রাজনীতিকে আমি চেয়েছি জনগণের অধিকার আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে। মাঠের মানুষ আমাকে ভালোবাসে বলেই আমি আবারও তাঁদের পাশে দাঁড়াতে চাই।

সম্প্রতি বিএনপিতে যোগ দেওয়া সাবেক সচিব আব্দুল বারী রাজনীতিতে এসেছেন দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, সততা ও জনসেবার মনোভাব নিয়ে। ২১ জুলাই ২০২৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে পা রাখার পর থেকেই তাঁর প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে। একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে অতীতে প্রশাসনে তিনি যে দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা দেখিয়েছেন, তা তাঁকে রাজনীতিতেও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।তিনি মনে করেন, রাজনীতিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দরকার অভিজ্ঞতা ও স্বচ্ছতা,আমি সেটিই আনতে চাই। অনেকেই মনে করছেন,দলীয় কোন্দল নিরসনে তাঁর মতো পরিশীলিত,নীতিনিষ্ঠ ও অভিজ্ঞ একজন প্রার্থী হলে জয়পুরহাট-২ এর রাজনীতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন আসতে পারে।

লায়ন সিরাজুল ইসলাম বিদ্যুৎ শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচিতেই নয়, জলবায়ু ও কৃষক ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা রেখে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন। তিনি কেন্দ্রীয় জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের জলবায়ু বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে কৃষি সংকট, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং কৃষকদের অধিকার নিয়ে নানা পর্যায়ে কাজ করছেন। তাঁর নেতৃত্বে স্থানীয় জনপদে আলোচনা সভা এবং জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি মানুষকে আন্দোলিত করেছে। তিনি বলেন, আমি শুধু রাজনীতির জন্য রাজনীতি করি না, আমি মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইকে রাজনীতিতে রূপ দিতে চাই।

প্রবাসফেরত প্রকৌশলী আমিনুর ইসলাম এক ভিন্নধর্মী প্রার্থী হিসেবে উঠে এসেছেন আলোচনায়। তিনি ২০২৫ সালে সিআইপি (এনআরবি) সম্মাননা অর্জন করেন সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রদানকারী হিসেবে। বিদেশে অবস্থান করেও এলাকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবিক সহায়তায় অবদান রেখে মানুষের আস্থাভাজন হয়েছেন। তরুণ ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রজন্মের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা দিন দিন বাড়ছে।তিনি মনে করেন, দেশকে উন্নত করতে হলে প্রবাসের অভিজ্ঞতা ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির সংমিশ্রণ দরকার।আমি তা-ই দিতে চাই আমার এলাকার মানুষের জন্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা ও উত্তরাঞ্চল জাতীয়তাবাদী ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক মো.আব্বাস আলী আওয়ামীলীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনে ১৭ বছরের অধিক সময় সক্রিয় থেকে দলীয় কর্মীদের মাঝে আস্থার জায়গা হয়ে উঠেছেন। অভিজ্ঞতা, ত্যাগ এবং নেতৃত্বের স্পষ্টতা তাঁকে দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে একজন শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।তাঁর ভাষায়,আমি লড়াই করেছি,লড়াই করে জায়গা করে নিতে জানি। প্রতিশ্রুতির রাজনীতি নয়, আমি করি সাহসের রাজনীতি।

এই ছয়জন প্রত্যেকেই এখন নিজের শক্তিমত্তা, প্রভাব এবং জনসম্পৃক্ততা তুলে ধরে দলের মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে রয়েছেন। কিন্তু এখানেই শুরু হয় সংকট। এতজন যোগ্য প্রার্থী থাকলেও চূড়ান্ত মনোনয়ন পাবেন একজনই। এই অবস্থায় তৃণমূলের মাঝে দ্বিধা,বিভক্তি ও অভ্যন্তরীণ চাপ প্রকট হয়ে উঠছে। অনেকে একে অপরের বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছেন না ঠিকই কিন্তু প্রত্যেকে নিজেদের প্রচারে ব্যস্ত ফলে মাঠে একধরনের প্রতিযোগিতা এবং বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দলীয় নেতাকর্মীদের বড় অংশই দোটানায় পড়েছেন,কাকে সমর্থন করবেন? কে হলে দলে ঐক্য আসবে?

এই অনিশ্চয়তার মাঝেই জামায়াতের একক প্রার্থী এস.এম রাশেদুল আলম সবুজ সুসংগঠিত কৌশলে মাঠে রয়েছেন।তিনি আক্কেলপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান এবং জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অতীতে ছিলেন ছাত্রশিবিরের জেলা সভাপতি। তাঁর নির্লোভ, নিষ্ঠাবান এবং ধার্মিক কর্মীসুলভ আচরণ তাঁকে গ্রামের ধার্মিক ভোটারদের মধ্যে শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে। মাঠপর্যায়ের ধর্মীয় কার্যক্রম এবং ইসলামি মূল্যবোধকে সামনে রেখে প্রচার- প্রচারণায় তিনি নিজের গ্রহণযোগ্যতা দিনে দিনে বাড়িয়ে তুলছেন। তিনি বলেন, আমি রাজনীতি করি জনগণের অধিকার, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষার জন্য। আমার প্রার্থিতা দল নয়, আদর্শের প্রতিনিধিত্ব।

জামায়াতের এমন সংগঠিত উপস্থিতি বিএনপির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে যদি শেষ মুহূর্তে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মেটানো না যায়। বিশ্লেষকদের মতে, একটি যোগ্য, গ্রহণযোগ্য, জনসম্পৃক্ত ও গ্রুপিংবিহীন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে পারলে বিএনপির সামনে আবারও জয়পুরহাট-২ পুনর্দখলের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হতে পারে। অন্যথায়, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচনী ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিতে পারে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

র‌্যাব-১২, এর অভিযানে সিরাজগঞ্জে গাঁজাসহ ০২ জন মাদক ব্যবসায়ী

1

যৌথবাহীনির মোবাইল কোট অভিযান সুনামগঞ্জ হাওর

2

কালাই আঁওড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ফাজিল পাসের আগেই শিক্ষক, স্ত্রীও

3

শিবচরে জোবায়ের হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ

4

বগুড়া শ্রমিক দলের ১৫নং ওয়ার্ডের ৬১ সদস্য বিশিষ্ট পূনাঙ্গ কমি

5

গণতন্ত্রের দুই প্রতীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে নির্বাচনী মাঠে আরও সক

6

নবাবগঞ্জের দিশবন্দী হাতিশাল ফাযিল মাদ্রাসায় বই বিতরণ

7

এবার আমরা ভোট করবো সত্যের পক্ষে জি কে,গউছ

8

গোবিন্দগঞ্জে খালেদা জিয়ার সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনায় বিশেষ দো

9

নওগাঁয় ডাব গাছ থেকে পড়ে এক যুবকের মৃত্যু

10

ইন্দুরকানী থানার সাঈদখালীর খালেকের দোতলা থেকে দিনমজুর মিজান

11

তাড়াইলে মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলের হাতে মা খুন

12

প্রচারণার প্রথম দিনেই মণিরামপুরে ইসলামী আন্দোলনের দোয়া ও আল

13

দিনাজপুর–৫ (পার্বতীপুর–ফুলবাড়ি) আসনে যাচাই-বাছাই শেষে ৯ প্রা

14

ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর উপলক্ষে গৌরনদীতে বিএনপির বিশাল জনসভা

15

মহেশখালীর সোনাদিয়া চ্যানেলে 'ফিশিং ট্রলার' জলদস্যুদের কবলে

16

নরসিংদীর শিবপুরে অস্ত্র ও মাদক জব্দ, ৭ জন গ্রেপ্তার

17

দিনাজপুর জেলা পুলিশের সকল ইউনিটে একযোগে পরিচ্ছন্নতা অভিযান

18

বগুড়ায় যৌথবাহিনীর অভিযানে দেশীয় মদসহ এক ব্যক্তি আটক

19

গড়েয়ায় আওয়ামীলীগ নেতার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন

20