আব্দুল আলিম।।
বাংলাদেশের বৃহত্তম জলাভূমি চলনবিল। বর্ষা এলেই এই বিলজুড়ে সৃষ্টি হয় অশেষ জলরাশি যেখানে চারদিকে শুধু পানি আর পানি। একসময় এই পানি কৃষকের কাছে ছিল আশীর্বাদ; ধান চাষে উর্বরতা আসত, মৎস্য সম্পদ বেড়ে যেত। কিন্তু এখন বর্ষার পানি আশীর্বাদের বদলে অভিশাপে পরিণত হয়েছে।বর্ষা নামার সঙ্গে সঙ্গে চলনবিলের বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যায়। এতে গ্রামীণ মানুষের চলাচল ব্যাহত হয়, বন্ধ হয়ে যায় বাজার-স্কুল-কলেজে যাতায়াত। একই সঙ্গে দেখা দেয় গবাদিপশুর খাদ্য সংকট। কারণ সব খোলা মাঠ, খড়ের জমি ও প্রাকৃতিক ঘাস পানির নিচে হারিয়ে যায়।ফলে গবাদিপশুর জন্য কৃষক ও খামারিদের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে কচুরিপানা। প্রতিদিন বিলের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে মানুষকে কচুরিপানা তুলতে দেখা যায়। কেউ নৌকায় ভরে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন, কেউ কাঁধে বোঝা করে টেনে আনছেন। নারী-পুরুষ, শিশু সবাই ব্যস্ত একমুঠ খাদ্যের সংগ্রামে।স্থানীয় কৃষক আব্দুল হালিম জানালেন, “বর্ষায় খড় বা ঘাস পাওয়া যায় না। গরু পালতে হলে কচুরিপানা ছাড়া উপায় নেই। তবে এতে পশু মোটাতাজা হয় না, শুধু বেঁচে থাকে।”
আরেক কৃষক জুয়েল বললেন, “এক বিঘা জমি থেকে সারা বছরের জন্য খড় মজুত করা যায় না। বর্ষার সময় বাজারে খড় কিনতে গেলে দাম আকাশচুম্বী। ফলে আমরা বাধ্য হয়ে কচুরিপানা খাওয়াই।”সরকারি উদ্যোগের অভাব কৃষক ও খামারিদের অভিযোগ, বহু বছর ধরে এ সমস্যার সমাধানে সরকারি কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। বর্ষার সময় পশুখাদ্যের জন্য জরুরি সহায়তা না থাকায় তারা প্রতি বছর একই দুর্ভোগে পড়েন।
বিশেষজ্ঞদের মতে,পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, “কচুরিপানা সাময়িকভাবে গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়, কিন্তু এতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি মেলে না। বরং দীর্ঘমেয়াদে পশুর স্বাস্থ্য ও দুধ-গোশতের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।”
তিনি পরামর্শ দেন, কৃষকদের বিকল্প ঘাস চাষ, সাইলেজ প্রস্তুত (ঘাসের বিশেষ সংরক্ষণ পদ্ধতি) এবং ধান কাটার মৌসুমে খড় সংরক্ষণে উৎসাহিত করা দরকার। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে খামারিদের প্রশিক্ষণ ও পশুখাদ্য সরবরাহে সরকারি উদ্যোগ জরুরি।
চলনবিলের মানুষ বলছেন, প্রতিবছর বর্ষায় এভাবে কচুরিপানার ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বরং পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে এ সমস্যার অবসান সম্ভব।
বর্ষা মৌসুমে বিকল্প খাদ্য সরবরাহ কর্মসূচি,স্থানীয়ভাবে পশুখাদ্য ব্যাংক গড়ে তোলা,
ও খড় সংরক্ষণে সরকারি ভর্তুকি দেওয়া হলে কৃষকরা উপকৃত হবেন।
প্রকৃতপক্ষে চলনবিলের কৃষক ও খামারিরা আজ এক অনিশ্চিত বাস্তবতার মধ্যে বেঁচে আছেন। বর্ষার পানি যেমন তাদের জনজীবন বিপর্যস্ত করছে, তেমনি গবাদিপশুর খাদ্য সংকটে ফেলছে মহাবিপাকে। কচুরিপানা হয়তো সাময়িক ভরসা দিচ্ছে, কিন্তু পুষ্টিহীন এ খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল থাকলে গবাদিপশুর সঠিক বিকাশ ও কৃষকের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সংক্ষেপে বলা যায়, বর্ষার পানিতে ডুবে যাওয়া চলনবিলের মানুষ আজ শুধু গবাদিপশু বাঁচিয়ে রাখার জন্যই কচুরিপানার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।