বর্তমান বিশ্বের শাসনব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্র সর্বাধিক প্রচলিত হলেও ইসলামী শরীয়াহর আলোকে এর বৈধতা নিয়ে আলেম ও গবেষকদের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক চলছে। একদল আলেম একে সরাসরি 'হারাম' বা 'শিরক' বলে আখ্যা দিলেও অন্য একটি বড় অংশ একে 'শূরা' বা পরামর্শভিত্তিক শাসনের একটি আধুনিক বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করার পক্ষে মত দিয়েছেন।
যারা গণতন্ত্রকে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক মনে করেন, তাদের আপত্তির মূলে রয়েছে তিনটি প্রধান কারণ:
১. সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন: গণতন্ত্রের মূলনীতি হলো "জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস"। কিন্তু ইসলামের মৌলিক আকিদা হলো—সার্বভৌমত্ব এবং চূড়ান্ত বিধান দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ। কুরআন ও সুন্নাহর বাইরে আইন প্রণয়নের কোনো অধিকার কারো নেই।
২. আইন প্রণয়নের সীমাবদ্ধতা: সংসদীয় পদ্ধতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে যেকোনো আইন পাস বা রদ করা যায়। যদি কোনো পার্লামেন্ট আল্লাহর স্পষ্ট বিধানের (যেমন: মদ, সুদ বা জুয়া) বিপক্ষে আইন তৈরি করে, তবে তা সরাসরি কুফর হিসেবে গণ্য হয়।
৩. যোগ্যতার মূল্যায়ন: ইসলামে নেতৃত্বের নির্বাচনে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও খোদাভীতিকে (তাকওয়া) মানদণ্ড করা হয়েছে। বিপরীতে, গণতন্ত্রে একজন অপরাধী এবং একজন পন্ডিত ব্যক্তির ভোটের মান সমান, যা অনেক আলেম মেনে নিতে পারেন না।
অন্যদিকে, শায়খ ইউসুফ আল-কারজাভীসহ বর্তমান যুগের অনেক বড় বড় ইসলামী চিন্তাবিদ ও দলগুলো গণতন্ত্রের কিছু দিককে জায়েজ বা গ্রহণযোগ্য মনে করেন। তাদের যুক্তিগুলো হলো:
শূরার আধুনিক রূপ: ইসলাম 'শূরা' বা পরামর্শের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তারা মনে করেন, আধুনিক যুগে নির্বাচন পদ্ধতি হলো শূরারই একটি সংগঠিত প্রক্রিয়া।
স্বৈরতন্ত্রের বিকল্প: একনায়কতন্ত্র বা জুলুমের চেয়ে গণতন্ত্র উত্তম। এটি জনগণের মতামত প্রকাশের সুযোগ দেয় এবং শাসকের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে।
মন্দের ভালো (Least Evil): পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যবস্থা না থাকা অবস্থায় ধর্মহীন কোনো অপশক্তিকে রুখতে গণতন্ত্রকে তারা একটি কৌশল হিসেবে দেখেন। একে তারা 'মন্দের ভালো' হিসেবে গ্রহণ করেন।
অধিকাংশ ইসলামী স্কলারের মতে, গণতন্ত্র যদি কেবল একটি 'পদ্ধতি' (Methodology) হিসেবে ব্যবহৃত হয়—যেখানে আল্লাহর চূড়ান্ত আইনকে পরিবর্তন করা হবে না এবং জনগণের ভোটের মাধ্যমে শুধুমাত্র যোগ্য নেতা নির্বাচন করা হবে—তবে তা গ্রহণ করা ইসলামে অবৈধ নয়। তবে যে গণতন্ত্র আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার করে মানুষকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার মালিক বানায়, তাকে ইসলাম সমর্থন করে না।
মূলত, দেশ ও কালের প্রেক্ষাপটে বৃহত্তর ইসলামী স্বার্থ রক্ষায় একে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে বলেই মনে করছেন আধুনিক ফকীহগণ।
মন্তব্য করুন