রবিউল ইসলাম
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার পুটাইল ইউনিয়নে অবস্থিত বেতিলা গ্রাম। ধলেশ্বরী নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই গ্রামটি এখন পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ, যার মূলে রয়েছে রহস্যময় ও নান্দনিক বেতিলা জমিদার বাড়ি। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের দিক দিয়ে এটি মানিকগঞ্জের অন্যতম সম্পদ হলেও, এর নির্মাণ ইতিহাস নিয়ে রয়ে গেছে এক বিশাল ধোঁয়াশা।
নির্ভরযোগ্য সূত্রের অভাব ও জনশ্রুতি
বেতিলা জমিদার বাড়ির প্রকৃত বয়স কত বা ঠিক কবে এটি নির্মিত হয়েছে, তার কোনো নির্ভরযোগ্য দালিলিক তথ্য আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় প্রশাসন কিংবা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছেও এই প্রাসাদের সঠিক ইতিহাস নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। তবে এই বাড়িটির গোড়াপত্তন নিয়ে এলাকায় দুটি প্রধান জনশ্রুতি প্রচলিত আছে:
১. বণিক সত্য বাবুর আখ্যান:
সবচেয়ে জনপ্রিয় মতটি হলো, সত্য বাবু নামের একজন ধনাঢ্য বণিক এই বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে জলপথই ছিল যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। ধলেশ্বরী নদী দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধার্থে তিনি এই নির্জন ও মনোরম স্থানটি বেছে নেন। মূলত এটি ছিল তার ব্যক্তিগত বসতবাড়ি, কিন্তু তার বিশাল প্রতিপত্তি আর আলিশান জীবনযাত্রার কারণে মানুষ একে ‘জমিদার বাড়ি’ বলতে শুরু করে।
২. কলকাতার বণিক জ্যোতি বাবুর যোগসূত্র:
গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠদের মতে, এই বাড়ির নাটের গুরু ছিলেন কলকাতার প্রভাবশালী বণিক জ্যোতি বাবু। বলা হয়, তিনি ছিলেন এই বংশের আদি পুরুষ। কলকাতা থেকে এসে তিনি এখানে ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য বিস্তার করেন এবং এই প্রাসাদসম বাড়িটি তৈরি করেন। সময়ের বিবর্তনে তাদের বংশধরেরা ভারতে চলে গেলেও টিকে থাকে তাদের এই স্মৃতিস্তম্ভ।
স্থাপত্যশৈলীর নান্দনিকতা
নির্মাণকাল অজানা থাকলেও বাড়িটির কারুকার্য বলে দেয় এটি ব্রিটিশ আমলের শেষ ভাগের স্থাপত্য। ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যরীতির ছোঁয়া রয়েছে পুরো বাড়ি জুড়ে। বাড়ির বিশাল সব পিলার, খিলান এবং জানালার কারুকার্য এখনও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। বাড়ির ভেতরে রয়েছে বিশাল আঙিনা, অন্ধকার সব কক্ষ এবং পলেস্তারা খসে পড়া দেয়াল, যা ভ্রমণপিপাসুদের এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা দেয়।
বর্তমান অবস্থা ও সংকট
এক সময় এই বাড়িতে উৎসবের আমেজ থাকলেও এখন সেখানে কেবলই নিস্তব্ধতা। সরকারিভাবে বাড়িটি সংরক্ষণের বিশেষ কোনো উদ্যোগ না থাকায় দিনে দিনে এর সৌন্দর্য ম্লান হচ্ছে। জানালার গ্রিল থেকে শুরু করে মূল্যবান শ্বেতপাথর অনেক আগেই চুরি হয়ে গেছে। দেয়ালের ফাটলে ডালপালা মেলেছে বুনো গাছপালা।
পর্যটন সম্ভাবনা
এত সীমাবদ্ধতার স্বত্ত্বেও প্রতিদিন মানিকগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা এই বাড়িটি দেখতে আসেন। অনেক চলচ্চিত্র ও নাটকের শুটিংও এখানে সম্পন্ন হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এই বাড়িটিকে সংস্কার করে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্র বা জাদুঘর হিসেবে গড়ে তোলা হলে এটি জেলার অর্থনীতির চেহারা বদলে দিতে পারে।
যথাযথ গবেষণা ও খনন চালালে হয়তো একদিন জানা যাবে সত্য বাবু কিংবা জ্যোতি বাবুর প্রকৃত পরিচয়। তবে আপাতত এটি বেতিলার মানুষের কাছে তাদের অতীতের এক গর্বিত ও রহস্যময় স্মারক হিসেবেই টিকে আছে।