রবিউল ইসলাম
মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপণ্য হাজারী গুড় আজ দেশজুড়ে পরিচিত একটি নাম। স্বাদ, সুগন্ধ ও বিশুদ্ধতার কারণে এই গুড়ের কদর রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যেমন বেড়েছে, তেমনি বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে ব্যাপক চাহিদা। তবে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কমে যাওয়ায় এই ঐতিহ্যবাহী গুড় এখন সংকটের মুখে।
নামকরণ যেভাবে
স্থানীয় প্রবীণ গাছি ও ইতিহাস সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক প্রজন্ম আগে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর এলাকায় ‘হাজারী’ নামে পরিচিত একটি পরিবার বিশেষ পদ্ধতিতে খেজুরের রস থেকে উন্নতমানের গুড় তৈরি শুরু করে। ওই পরিবারের নাম থেকেই এই গুড়ের নামকরণ হয় ‘হাজারী গুড়’। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই নামই ব্র্যান্ডে পরিণত হয়।
উৎপাদন এলাকা ও পদ্ধতি
মূলত মানিকগঞ্জের হরিরামপুর, ঘিওর ও শিবালয় উপজেলার কিছু নির্দিষ্ট গ্রামে শীত মৌসুমে হাজারী গুড় তৈরি করা হয়। ভোররাতে সংগ্রহ করা টাটকা খেজুরের রস দীর্ঘ সময় ধরে জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় এই গুড়। এতে কোনো ধরনের কেমিক্যাল, চিনি বা কৃত্রিম রং ব্যবহার করা হয় না।
বাজারদর ও বিক্রি
চলতি মৌসুমে মানিকগঞ্জ ও ঢাকার বাজারে হাজারী গুড়ের দাম
প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ১,২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। মান ও পুরোনো খেজুর গাছের রস থেকে তৈরি গুড়ের দাম আরও বেশি।
ব্যবসায়ীরা জানান, ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে এই গুড়ের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
দেশ-বিদেশে চাহিদা,
দেশের বিভিন্ন জেলার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকেও প্রতিবছর হাজারী গুড়ের অর্ডার আসে। অনেক ক্ষেত্রে মৌসুম শুরুর আগেই অগ্রিম বুকিং নিতে হয়।
সংকট ও উদ্বেগ,
উৎপাদকদের অভিযোগ, খেজুর গাছ কমে যাওয়া, দক্ষ গাছির সংকট, শ্রম ও জ্বালানির খরচ বৃদ্ধি এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে উৎপাদন দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলে শত বছরের ঐতিহ্য বহনকারী এই গুড় ভবিষ্যতে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মত,
কৃষি ও খাদ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হাজারী গুড়কে ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে এর ঐতিহ্য রক্ষা ও বাজার সম্প্রসারণ সম্ভব হবে।
মানিকগঞ্জের হাজারী গুড় শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়, এটি এ অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যথাযথ উদ্যোগ ও সংরক্ষণ না হলে এই ঐতিহ্য বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।