মেহেদী হাসান হাবিবইসলামী বিধান অনুযায়ী সামর্থ্যহীনদের বিবাহে সতর্কতা বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা
পরিসংখ্যানের ভয়াল চিত্র
ইসলামী বিধান: সামর্থ্য না থাকলে রোজা রাখা উত্তম
কেন বাড়ছে এই প্রবণতা?
প্রতিকারের পথ কী?
বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগে ‘টুপটাপ প্রেম’ আর ‘আবেগী স্বপ্ন’ থাকলেও বাস্তবতার কশাঘাতে তা ফিকে হয়ে যাচ্ছে খুব দ্রুত। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ। আর এর অন্যতম প্রধান নেপথ্য কারণ হিসেবে উঠে আসছে স্বামীর আর্থিক অস্বাবলম্বিতা এবং পরিবারের ভরণপোষণ বহনে অক্ষমতা। বিশেষ করে কর্মহীন বা অপর্যাপ্ত আয়ের যুবকদের বিয়ের ক্ষেত্রে বিচ্ছেদের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেশি থাকছে।
রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশন ও জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়গুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি বছরই বিবাহবিচ্ছেদের আবেদনের সংখ্যা রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে নারীদের পক্ষ থেকে জানানো অভিযোগের একটি বড় অংশ হলো—স্বামীর বেকারত্ব, অলসতা এবং ভরণপোষণের অভাব।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, "এক সময় বিচ্ছেদ কেবল উচ্চবিত্ত সমাজে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। আর্থিক ভিত্তি শক্ত না করে বিয়ে করার ফলেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।"
ইসলাম বিবাহকে সামাজিক ও ইবাদতের অংশ হিসেবে দেখলেও একে একটি দায়িত্বশীল চুক্তি হিসেবে গণ্য করেছে। আর্থিক ও শারীরিক সক্ষমতা ছাড়া বিয়ে করার ক্ষেত্রে ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
আল-কুরআনের দিকনির্দেশনা: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, “আর যাদের বিয়ের সামর্থ্য নেই, তারা যেন সংযম অবলম্বন করে (অপেক্ষা করে) যতক্ষণ না আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করেন।” (সূরা নূর: ৩৩)
হাদিসের সতর্কবাণী: রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন, “হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহের সামর্থ্য (বিত্ত ও সক্ষমতা) রাখে তারা যেন বিয়ে করে। আর যার সেই সামর্থ্য নেই সে যেন রোজা রাখে।” (সহিহ বুখারি)
ইসলামী আইনজ্ঞদের মতে, একজন পুরুষ যদি জানে যে সে তার স্ত্রীর ন্যূনতম মোহরানা ও অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে না, তবে তার জন্য বিয়ে করা মাকরুহ বা ক্ষেত্রবিশেষে অনুচিত।
প্রতিবেদনে উঠে আসা কিছু মূল কারণ:
১. আবেগী সিদ্ধান্ত: ক্যারিয়ার গড়ার আগেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া।
২. পারিবারিক চাপ: অপ্রস্তুত সন্তানকে জোর করে বিয়ে দেওয়া।
৩. বিলাসবহুল জীবন ও ঋণ: সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে ধুমধাম করে বিয়ে করে পরে ঋণের দায়ে সংসার অশান্তিতে নিমজ্জিত হওয়া।
৪. দায়িত্বহীনতা: আয়ের উৎস ছাড়াই কেবল যৌতুক বা অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে সংসার শুরু করা।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, বিচ্ছেদ রোধে সমাজ ও পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানো জরুরি।
স্বাবলম্বী হওয়া: বিয়ের আগে পুরুষের নুন্যতম স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
কাউন্সেলিং: বিবাহের ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে তরুণদের সচেতন করা।
মোহরানা ও হক আদায়: স্ত্রীর হক ও মোহরানাকে বোঝা মনে না করে তা আদায়ের সক্ষমতা গড়ে তোলা।
উপসংহার: টেকসই দাম্পত্য জীবনের জন্য ভালোবাসা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন আর্থিক স্থায়িত্ব। ইসলাম সামর্থ্য অর্জনের ওপর জোর দিয়েছে যাতে পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটি ভেঙে না পড়ে। সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে হুজুগের বসে বিয়ে না করে সুন্নাহ অনুযায়ী স্বাবলম্বী হয়ে বিয়ে করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
মন্তব্য করুন