মোঃ রাতুল হাসান লিমন
ভারতের বড় শহরগুলো আজ ক্রমেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। বিষাক্ত বাতাস, যানজটে স্থবির সড়ক, অদূরদর্শী নগর পরিকল্পনা আর বছরের পর বছর পরিষ্কার না হওয়া আবর্জনা—সব মিলিয়ে নগরজীবন এখন এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
রাজস্থানের রাজধানী জয়পুরের চিত্রই ধরা যাক। ঐতিহ্যবাহী প্রাসাদ ও দুর্গের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত এই শহর আজ অবহেলা আর বিশৃঙ্খলার প্রতিচ্ছবি। সফরের সময় এক ট্যাক্সিচালকের মন্তব্যে ফুটে ওঠে নগরবাসীর হতাশা—‘জয়পুরের রাজকীয় সৌন্দর্য দেখতে চাইলে এখানে আসবেন না, পোস্টকার্ড কিনে নিলেই হবে।’
এই হতাশা শুধু জয়পুরে সীমাবদ্ধ নয়। দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরুসহ ভারতের প্রায় সব বড় শহরেই একই চিত্র—দূষিত বাতাসে ঢেকে থাকা আকাশ, যানজটে আটকে থাকা মানুষ আর রাস্তার পাশে জমে থাকা ময়লার স্তূপ।
অথচ গত এক দশকে অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে ভারত সরকার। আধুনিক বিমানবন্দর, প্রশস্ত জাতীয় মহাসড়ক, মেট্রোরেল—সবই তৈরি হয়েছে। তবু আন্তর্জাতিক লাইভেবিলিটি সূচকে ভারতের শহরগুলো এখনো পিছিয়ে।
গত এক বছরে জনঅসন্তোষ আরও স্পষ্ট হয়েছে। বেঙ্গালুরুতে যানজট ও আবর্জনা সমস্যায় ক্ষুব্ধ হয়ে সাধারণ নাগরিকের পাশাপাশি শীর্ষ প্রযুক্তি উদ্যোক্তারাও প্রকাশ্যে ক্ষোভ ঝেড়েছেন। মুম্বাইয়ে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা ও গর্তে ভরা সড়কের প্রতিবাদে বিরল বিক্ষোভ হয়েছে। দিল্লিতে প্রতিবছরের শীত এলেই মারাত্মক বায়ুদূষণে শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—চীনের মতো দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কেন ভারতের শহরগুলো পুনর্জন্ম পাচ্ছে না?
অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ বিনায়ক চ্যাটার্জির মতে, সমস্যার শিকড় ঐতিহাসিক। তিনি বলেন, ভারতের সংবিধানে কেন্দ্র ও রাজ্যের ক্ষমতা বণ্টনের কথা থাকলেও শহরগুলো যে একদিন এত বড় ও জটিল হয়ে উঠবে, সে অনুযায়ী কার্যকর নগর শাসন কাঠামো গড়ে তোলা হয়নি।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বর্তমানে ভারতের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ শহরে বসবাস করে—১৯৬০ সালে যা ছিল মাত্র ৭ কোটি। ১৯৯২ সালে সংবিধানের ৭৪তম সংশোধনের মাধ্যমে নগর সংস্থাগুলোকে ক্ষমতায়নের চেষ্টা করা হলেও বাস্তবে তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক ও بيرোক্রেটিক স্বার্থের কারণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পায় না। ফলে নগর উন্নয়নের সিদ্ধান্তগুলো রাজ্য সরকারের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে।
চীনের ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। সেখানে মেয়রদের হাতে নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো ও বিনিয়োগ অনুমোদনের মতো শক্তিশালী ক্ষমতা থাকে। কেন্দ্রীয় নির্দেশনার সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবায়নের স্বাধীনতা থাকায় শহরগুলো দ্রুত রূপান্তরিত হয়েছে।
ভারতের নগর ব্যবস্থায় তথ্য ঘাটতিও বড় সমস্যা। সর্বশেষ আদমশুমারি হয়েছে ২০১১ সালে। ধারণা করা হচ্ছে, এখন দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী নগরজীবনের সঙ্গে যুক্ত। তবে নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকায় পরিকল্পনা গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ছে।
নগর বিশেষজ্ঞ অঙ্কুর বিসেন বলেন, স্থানীয় সরকারগুলোই রাষ্ট্রের সবচেয়ে দুর্বল কাঠামো—তারা নাগরিকদের সবচেয়ে কাছে থেকেও সবচেয়ে কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হয়, অথচ প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও সম্পদ পায় না।
কিছু ব্যতিক্রমী উদাহরণ রয়েছে—যেমন ১৯৯০-এর দশকে সুরাট বা সাম্প্রতিক সময়ে ইন্দোর। তবে সেগুলো ব্যক্তিগত নেতৃত্বের ফল, টেকসই ব্যবস্থার নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের নগর সংকট এখনো রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। তবে ইতিহাস বলে, সংকট যখন চরমে পৌঁছে, তখনই পরিবর্তনের দাবি জোরালো হয়। লন্ডনের ‘গ্রেট স্টিংক’-এর মতো বড় কোনো ধাক্কাই হয়তো ভারতের শহরগুলোকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।