মিয়া সুলেমান
গ্রামীণ সমাজে বিবাদ একটি পরিচিত ও দীর্ঘদিনের সামাজিক বাস্তবতা। নানা কারণে এসব বিবাদ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পদের সীমাবদ্ধতা, পারিবারিক জটিলতা ও প্রথাগত মানসিকতা গ্রামাঞ্চলে দ্বন্দ্বকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।
গ্রামীণ এলাকায় জমি, পানি ও চারণভূমির মতো সীমিত সম্পদ নিয়ে প্রতিযোগিতা বিবাদের অন্যতম প্রধান কারণ। একই সঙ্গে একই বংশ বা আত্মীয়দের মধ্যে উত্তরাধিকার, জমির ভাগাভাগি, বিয়ে কিংবা সামাজিক সম্মান (ইজ্জত) নিয়ে দ্বন্দ্ব বহু বছর ধরে চলতে দেখা যায়। সামাজিক রীতি ও প্রথাগত বিচারব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে বিরোধ নিষ্পত্তির পরিবর্তে তা আরও জিইয়ে রাখে।
এছাড়া আইনি শিক্ষা ও সচেতনতার অভাবও বড় ভূমিকা রাখে। আইনি অধিকার ও আধুনিক বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে মানুষ পুরনো শত্রুতা আঁকড়ে ধরে রাখে। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা মাতব্বরদের ক্ষমতার রাজনীতিও অনেক সময় বিবাদকে উসকে দেয় বা নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে ব্যবহার করা হয়। আদালতের জটিলতা, ব্যয় ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেকেই আনুষ্ঠানিক আইনি পথে না গিয়ে বিরোধ চালিয়ে যেতে বাধ্য হন। গ্রামাঞ্চলের ঘনিষ্ঠ সামাজিক সম্পর্কের কারণে ছোট ঘটনাও বড় আকার ধারণ করে এবং সহজে ভুলে যাওয়া যায় না।
সরেজমিন ঘুরে মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, তথা-কথিত মাতাব্বর, খুচরা রাজনীতিবিদ ও নিপীড়নকারী সিন্ডিকেট কখনোই চায় না বিবাদ মিমাংসা হোক। ঐ গোষ্টি বরং শোষণে থাকে নিমজ্জিত। এ ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদ সংশ্লিষ্টরাও বাদ নেই। তাদের কাছে মানুষ আজ বিচার চেয়ে অসহায়।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিবাদ থেকে যদি সহিংসতা, আইনভঙ্গ বা অপরাধ সংঘটিত হয়, তাহলে তার জন্য কঠোর আইনগত শাস্তির বিধান রয়েছে। বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০ অনুযায়ী মারামারি বা আঘাতের ক্ষেত্রে ধারা ৩২৩ অনুযায়ী এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানার বিধান রয়েছে। গুরুতর আঘাতের ক্ষেত্রে ধারা ৩২৫ ও ৩২৬ অনুযায়ী ৭ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। ভয়ভীতি প্রদর্শনের জন্য ধারা ৫০৬ অনুযায়ী দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানা এবং দলগত সংঘর্ষ বা দাঙ্গার ক্ষেত্রে ধারা ১৪৭ থেকে ১৪৯ অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারিত। সম্পত্তি ক্ষতির ক্ষেত্রেও দণ্ডবিধিতে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী শান্তি ভঙ্গের আশঙ্কায় ধারা ১০৭-এর মাধ্যমে মুচলেকা নেওয়া এবং সংঘাত ঠেকাতে ধারা ১৪৪ জারি করা হয়। ছোটখাটো গ্রামীণ বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬ অনুযায়ী জরিমানা ও আপসের মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ রয়েছে, যেখানে সাধারণত সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। জমি বা উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিরোধে দেওয়ানি মামলার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ, দখল পুনরুদ্ধার বা স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ সমাজে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আইনি সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত ও সহজ বিচারপ্রক্রিয়া এবং সামাজিকভাবে সহনশীলতা ও পারস্পরিক সমঝোতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। তবেই গ্রামাঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী বিবাদ কমে আসতে পারে।
ছবিটিকে প্রতীকি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।