মনির আহমদ আজাদ
চট্টগ্রাম–১৫ (সাতকানিয়া–লোহাগাড়া) আসন বরাবরই জাতীয় নির্বাচনে একটি ব্যতিক্রমী ও কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে আসছে। এই আসনের ভোটের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে আদর্শিক রাজনীতির চেয়েও জোটের সমীকরণ, সাংগঠনিক ঐক্য এবং স্থানীয় নেতৃত্বের ভূমিকা বেশি প্রভাব ফেলেছে নির্বাচনী ফলাফলে। অতীতে একাধিক নির্বাচনে বিএনপি শরীক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে বিজয়ী হয়েছে, ফলে বিএনপির নিজস্ব একক শক্তির বাস্তব পরীক্ষা খুব একটা হয়নি। এবার সেই বাস্তবতা বদলেছে। জামায়াতে ইসলামী বিএনপির সঙ্গে জোটভুক্ত না থাকায় দীর্ঘ সময় পর বিএনপি এককভাবে দলীয় প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে মাঠে নেমেছে। প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন নাজমুল মোস্তফা আমিন—যিনি দলীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয়, স্থানীয়ভাবে পরিচিত এবং সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতা হিসেবে পরিচিত। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, জোট ছাড়াই এই আসনে বিএনপি কতটা প্রস্তুত এবং দলীয় ঐক্য আদৌ কতটা কার্যকর রয়েছে? স্থানীয় ভোটের ধরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চট্টগ্রাম–১৫ আসনে একটি উল্লেখযোগ্য অংশের ভোট দীর্ঘদিন ধরে জোটের ছায়ায় পরিচালিত হয়েছে। জামায়াতের সংগঠিত ভোটব্যাংক এবং বিএনপির বিস্তৃত জনভিত্তি মিলেই অতীতে বিজয়ের সমীকরণ তৈরি করেছে। এবার সেই সমীকরণ ভাঙায় একটি অংশের ভোট বিভাজনের আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির নিজস্ব ভোটব্যাংক এখনো সংখ্যাগরিষ্ঠ পর্যায়ে রয়েছে, তবে তা কার্যকর করতে সংগঠনের সর্বস্তরের সক্রিয়তা জরুরি। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার বিভিন্ন স্তরের বিএনপি নেতাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের কিছু গ্রুপিং ও নেতৃত্বকেন্দ্রিক বিরোধ এখনো পুরোপুরি মিটে যায়নি। মাঠপর্যায়ে কোথাও কোথাও একই দলে থেকেও পরস্পরের বিরুদ্ধে নীরব অবস্থান, কর্মসূচিতে অনীহা কিংবা ‘নিষ্ক্রিয় সমর্থন’-এর প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাজনৈতিক ভাষায় যাকে বলা হয়—ভিতরের বিরোধী শক্তি—এই প্রবণতাই বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। একাধিক স্থানীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, “প্রার্থী নিয়ে আপত্তির চেয়ে সমস্যা বেশি ব্যক্তিগত প্রভাব ও নেতৃত্বের প্রশ্নে। যদি সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে ছাড় না দেয়, তাহলে এর প্রভাব ভোটের দিন বোঝা যাবে।” এই বক্তব্যগুলো ইঙ্গিত দেয়, চ্যালেঞ্জটা বাইরের প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ভেতরের ব্যবস্থাপনায় বেশি। নাজমুল মোস্তফা আমিনের রাজনৈতিক প্রোফাইল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি তৃণমূল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, সাংগঠনিক কাঠামো বোঝেন এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে যোগাযোগে অভিজ্ঞ। তবে জোটবিহীন এই নির্বাচনে তাঁকে শুধু ভোটারদের নয়, দলের ভেতরের সব পক্ষকেও এক ছাতার নিচে আনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, তিনি যদি নিজেকে ‘একক কোনো গ্রুপের প্রার্থী’ নয়, বরং ‘সমগ্র বিএনপির প্রার্থী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তাহলে সেটিই হবে তাঁর বড় রাজনৈতিক সাফল্য। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বলছে, সাতকানিয়া–লোহাগাড়ায় বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি এখনো এমন পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে দলীয় ঐক্য নিশ্চিত হলে প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের পক্ষে জয় ছিনিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতারা সক্রিয় হলে, ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে ভোটার উপস্থিতি—সব ক্ষেত্রেই বিএনপি স্পষ্ট সুবিধাজনক অবস্থানে যেতে পারে। চট্টগ্রাম–১৫ আসনের এই নির্বাচন মূলত বিএনপির জন্য একটি রাজনৈতিক পরীক্ষাগার। এখানে প্রশ্ন শুধু প্রার্থী বা প্রতীক নয়; প্রশ্ন হলো—জোট ছাড়া বিএনপি নিজ শক্তিতে কতটা সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে। যদি দলীয় ঐক্য নিশ্চিত হয়, তাহলে এই আসন বিএনপির জন্য একটি আত্মবিশ্বাসী বার্তা দেবে। আর যদি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রাধান্য পায়, তাহলে সেই দুর্বলতাই অন্যদের সুযোগ করে দিতে পারে। ফলে চট্টগ্রাম–১৫ এর ফলাফল অনেকাংশেই নির্ধারিত হবে বিএনপির ঘরের ভেতরের রাজনীতির ওপর।
মন্তব্য করুন