শরিফ ওসমান হাদিকে কেউ যদি দলীয় চোখে দেখেন, তাহলে ভুল করছেন। প্রকৃত অর্থে, তিনি সংগ্রাম এবং আত্মোপলব্ধির এক নাম। হাদি এমন একজন মানুষ, যাকে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার ভেতর আটকে দিলে, ইতিহাস সংকুচিত হয়ে যাবে। তিনি আসলে এক আদর্শের নাম যেখানে আপস, ভয়, দ্বিধা নেই। যে সমাজে সত্য বলা ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষ স্বাভাবিকভাবে একা। হাদিও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। কিন্তু তার একাকিত্ব ছিল দায়িত্বশীল, সচেতন এবং আত্মমর্যাদায় পূর্ণ।
দেশমাতৃকার কল্যাণে ওসমান হাদি নামের ফুলটি কেবল ফুটতে শুরু করেছিল। পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার আগেই তার সুবাস ছড়িয়ে পড়েছিল ৫৬ হাজার বর্গমাইলের অলিগলিতে। ঘরে ঘরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, এক তরুণের কণ্ঠ যে কণ্ঠ ঘুমন্ত বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। কাঁপুনি ধরিয়েছিল সীমান্তের ওপারের শত্রুদের বুকেও। কিন্তু ইতিহাসের পুরনো নিয়ম যে আলো বেশি উজ্জ্বল হয়, তাকেই আগে নিভিয়ে দিতে চায় অন্ধকার। হাদিকে বাঁচতে দেওয়া হয়নি। কারণ হাদিরা বাঁচলে, সুবিধাবাদীদের মুখোশ খুলে যায়।
কাপুরুষেরা চিরকাল সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পেয়েছে। তারা আদর্শকে দমিয়ে দিতে চেয়েছে পেশিশক্তির প্রয়োগে। যুগে যুগে তারা ষড়যন্ত্র চালিয়েছে, আড়াল থেকে চোরাগোপ্তা আঘাত হেনেছে। যারা সত্যকে ভয় পায়, দেশপ্রেমের মধ্যে নিজের বিপন্নতা দেখে, তারা হাদিদের বিরুদ্ধে যাবেই। অথচ হাদিরা তো শতাব্দীতে একবারই আসে। আসে অন্যায়, অনৈতিকতা আর অবৈধতার সাজানো বন্দোবস্ত দুমড়ে মুচড়ে দিতে। শুধু স্বপ্ন দেখিয়ে ক্ষান্ত হয় না তারা, স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথও দেখিয়ে দেয়। এ কারণেই তাদের বাঁচতে দেওয়া হয় না। হাদিকে হত্যাযোগ্য করে তোলার দায়, কেবল প্রকাশ্য শত্রুদের নয়। হয়তো আরও কারও রয়েছে। কিন্তু সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য হাদিকে একাই বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে হয়েছে। বলতে হয়েছে, কোটি মানুষের না-বলা কথা। অথচ আমরা প্রত্যেকে যদি যার যার জায়গা থেকে ন্যায়ের কথা বলতাম, অধিকার ও ইনসাফের পক্ষে দাঁড়াতাম তবে হাদি আলাদা করে টার্গেট হতো না। তখন হাদির কণ্ঠ, রাষ্ট্র ও সমাজের স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর হিসেবেই বিবেচিত হতো। শত্রুও তার মস্তিষ্ককে লক্ষ্যবস্তু বানানোর সুযোগ পেত না। অনেকের দেশপ্রেম শর্তসাপেক্ষ, দলীয় ব্র্যাকেটে বন্দি। কিন্তু হাদির দেশপ্রেম ছিল, দল-মতের ঊর্ধ্বে ওঠা এক অকৃত্রিম দায়বদ্ধতা। আমৃত্যু তিনি আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করেছেন। লড়াই করেছেন ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য। যে ইনকিলাবের কথা তিনি বলেছেন তা কোনো আবেগি স্লোগান ছিল না। ছিল সুস্পষ্ট নৈতিক অবস্থান।
আমার মৃত্যু হলে কতজন কাঁদবে? হিসাব করে দেখেছি, বড়জোর চারজন। তাও যদি বাবা-মা বেঁচে থাকেন। আর হাদির জন্য কাঁদছে কতজন? হাদির জন্য দোয়া করছে কতজন? এর আগে তার সুস্থতার জন্য, তার বেঁচে থাকার আশায় সমগ্র দেশ একসঙ্গে দাঁড়িয়েছে। এই ভালোবাসা ক’জনের ভাগ্যে জোটে? হাদি কেবল একজন মানুষ ছিলের না মনে হয়, হাদিই বাংলাদেশ। তার বুক যেন বাংলাদেশের হৃদয়। হাদির মা এবং হাদির সন্তানের মায়ের কথা ভাবলে, বুক ভারী হয়ে আসে। সন্তান ফিরবে, সন্তানের বাবা ফিরবে এই আশায় দুই মায়ের এক সপ্তাহের অপেক্ষা আর আমাদের এক সপ্তাহ একই জিনিস নয়। চোখের পানি, মনের আকুতি আর প্রার্থনার শক্তি ছাপিয়ে তাদের দুনিয়ায় নেমে এসেছে এমন অন্ধকার, যা রাতের অন্ধকারকেও হার মানায়। হাদির ছেলেটা যেদিন বাবার শূন্যতা বুঝবে, সেদিন বাংলাদেশ হাদিপুত্রকে কী কৈফিয়ত দেবে? আমি স্বীকার করি, আমি বিড়ালের মতো ৫০০ বছর বাঁচতে চাই। সিংহের মতো অল্প সময় বাঁচার সাহস আমার নেই। কালোকে কালো বলার যে সৎসাহস, তা আমার মধ্যে নেই। শক্তের ভক্ত, নরমের যম হয়ে বাঁচি। আমাকে দুই টাকায় কেনা যায়। হাদিকেও কিন্তু কেনা যেত, তবে টাকায় নয়, ভালোবাসায়। এখানেই হাদির শ্রেষ্ঠত্ব আর আমাদের লজ্জা।
হাদি কি হারিয়ে যাবে? কখনোই না। মানুষকে হত্যা করা যায়, কিন্তু মতবাদকে হত্যা করা যায় না। হাদিবাদ অমর। ইতিহাসের পরতে পরতে যতদিন জুলুম থাকবে, আধিপত্যবাদের আগ্রাসন থাকবে এবং সত্য থাকবে ততদিন হাদি বাঁচবে। একজন হাদিকে হত্যা করা মানে হাজার হাজার হাদির জন্মের বীজ বপন করা। তেত্রিশ বছরের জীবনে দেশপ্রেমের প্রশ্নে হাদি যে ইমপ্যাক্ট রেখে গেছে, সেটাই তার সফলতা। কাপুরুষের মতো শত বছর বেঁচে থাকার মধ্যে কোনো গৌরব নেই। ইতিহাসের প্রত্যেক হাদি ক্ষণজন্মা কিন্তু সেই ক্ষণ দিয়েই তারা যুগ তৈরি করেন। তাদের কবরে পাঠানো যায়, কিন্তু তাদের জ্বালানো সত্যের বারুদ নেভানো যায় না। হাদির মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, রাষ্ট্র শুধু মানচিত্র নয়। রাষ্ট্র গড়ে ওঠে কিছু মানুষের রক্ত, সাহস আর নৈতিক দৃঢ়তার ওপর। যারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মাথা নত করে না। যারা জানে, জীবন ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু দায়িত্ব ও কর্তব্যের হিসাব ইতিহাস রাখে।
করুণ বাস্তবতা হলো, হাদির সন্তান আর বাবাকে ফিরে পাবে না। হাদির মা পাবে না, তার সন্তানকে। এই শূন্যতার কোনো ক্ষতিপূরণ নেই। তবুও এক অনিবার্য প্রশ্ন আমরা কি এমন মানুষদের কেবল স্মরণ করব, নাকি তাদের আদর্শ বাঁচিয়ে রাখব? ওসমান হাদিকে যারা গুলি করেছে তারা পশু, পাষ- কিন্তু তাকে হত্যা করতে পারেনি। কারণ যারা সত্যের পক্ষে জীবন দেয়, তারা মৃত্যুর পর বিবেক হয়ে ফিরে আসে। এই জায়গায় এসে নিজের দিকে তাকালে লজ্জা লাগে। তাই বারবার বলি হাদির জীবনকে ঈর্ষা হয়, মরণকেও। সে যেভাবে বেঁচেছে, তাতে আপস নেই। আর যেভাবে মরেছে, তাতে পরাজয় নেই। আমি দীর্ঘ জীবন চাই, নিরাপদ জীবন চাই। আর হাদি চেয়েছিল, অর্থবহ জীবন। এখানেই সে মহান আর আমি ক্ষুদ্র। হাদি বেঁচে আছে প্রার্থনায়, বেঁচে আছে তরুণদের চোখে। বেঁচে আছে সেই প্রশ্নে, আমরা কীভাবে বাঁচব নীরবে, আপসে, নাকি সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে?
মন্তব্য করুন