মিয়া সুলেমান
স্বাধীনতার ইতিহাস কোনো বিতর্কের বিষয় নয়—এটি আমাদের সম্মিলিত গৌরবের নাম। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, যাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা, সেই মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে নির্মিত বহু স্থাপনা আজ অবহেলায় বেহাল দশায় দাঁড়িয়ে আছে। ভাঙাচোরা স্মৃতিস্তম্ভ, অযত্নে ঢাকা স্মরণফলক যেন নীরবে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—আমরা কি
সত্যিই আমাদের ইতিহাসকে ধারণ করতে পেরেছি?
ডিসেম্বর এলেই হৃদয়ের ভেতর সযত্নে লালিত অনুভূতিগুলো নতুন করে জেগে ওঠে। কারণ এটি আমাদের বিজয়ের মাস—মহান আত্মত্যাগ, সাহস ও অবিনাশী স্বপ্নের মাস। ১৯৪৭-এর বিভাজন থেকে ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়—এই দীর্ঘ ইতিহাস একসময় আমরা গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়েছি, শুনেছি, বিশ্লেষণ করেছি। প্রতিটি বাঁকে ছিল জাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, সংগ্রামের উত্তাপ এবং অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা। আমার ক্ষুদ্র বোধে যতটুকু বুঝেছি, সমসাময়িক বিশ্বের ইতিহাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মতো ন্যায্য, নৈতিক ও মানবিক
সশস্ত্র সংগ্রাম বিরল। সেই সংগ্রামের ফলেই আজ আমি একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক—এই ভাবনা আমার অস্তিত্বকে গৌরবে ভরিয়ে দেয়।
স্বাধীনতার পরও এই জাতি থেমে থাকেনি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে হয়েছে ’৯০–এর স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলন, হয়েছে নানা গণজাগরণ, সর্বশেষ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—বাঙালি অন্যায় মেনে নেয় না। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার স্বাধীনতার ইতিহাসে বাঙালির ভূমিকা অনস্বীকার্য।
তবু এক তিক্ত সত্য মানতেই হয়—বাঙালি অনেক সময় নিজের অর্জনের মূল্য ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ৫৫ বছর পরেও আমরা জাতীয় ইতিহাসের মৌলিক সত্যগুলো নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে নির্মিত স্থাপনাগুলোর বর্তমান বেহাল দশা সেই ব্যর্থতারই প্রতীক। এগুলো শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; এগুলো আমাদের আত্মপরিচয়ের দৃশ্যমান দলিল। এগুলোর অবহেলা মানে ইতিহাসের প্রতিই অবহেলা।
মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। স্বাধীনতার পরবর্তী প্রতিটি আন্দোলনের শহীদ নিঃসন্দেহে শ্রদ্ধেয়, কিন্তু সেগুলোর সঙ্গে ১৯৭১-কে তুলনা করা অনুচিত। ১৯৭১ কোনো সাধারণ রাজনৈতিক ঘটনা নয়—এটি জাতির জন্মের ইতিহাস, রক্তে লেখা আত্মপরিচয়। একে খাটো করা মানে নিজের শেকড় অস্বীকার করা।
দুঃখের বিষয়, বর্তমান প্রজন্মের একটি অংশ জাতীয় ইতিহাসের প্রতি উদাসীন। কিন্তু এর দায় শুধু তাদের নয়—পরিবার, শিক্ষা ব্যবস্থা, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্র সবাই মিলে এই শূন্যতার জন্ম দিয়েছে। ইতিহাসে বিশ্বাস রাখা অনেক সময় যুক্তির ঊর্ধ্বে। যেমন—আপনি আপনার বাবাকে ‘মায়ের স্বামী’ না বলে ‘বাবা’ বলেন, কারণ সেখানে বিশ্বাস ও সম্পর্ক কাজ করে। ইতিহাসও তেমনই।
সৈয়দ মুজতবা আলীর কথা এখানে প্রাসঙ্গিক। তিনি লিখেছিলেন—“আমার সন্তান আছে, সেটা দেখাতে পারি; কিন্তু তাকে কীভাবে উৎপাদন করলাম, তা তো দেখাতে পারি না।” ইতিহাসের অস্তিত্বও তেমন—প্রমাণের জন্য নতুন করে জন্ম দেখানোর প্রয়োজন নেই।
প্রিয় তরুণ প্রজন্ম, জাতীয় ইতিহাস আছে, থাকবে। মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে স্থাপনা সংরক্ষণ, তাদের সম্মান রক্ষা করা মানে নিজের পরিচয়কে সম্মান করা। সব সত্য উচ্চারণের দরকার নেই, সব কিছুর যুক্তি খোঁজাও জরুরি নয়—কিছু সত্য বিশ্বাসে বাঁচে, হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।
১৯৭১ আমাদের অহংকার, আমাদের গৌরব, আমাদের অস্তিত্ব। আর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে যে সাহস ও প্রতিবাদের মেরুদণ্ড দেখা গেছে, তার শেকড়ও প্রোথিত ১৯৭১-
এর মুক্তিযুদ্ধে। যেখানে বীরেরা জীবন দিয়ে শিখিয়ে গেছেন—অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই বাঙালির চূড়ান্ত পরিচয়।
সেই পরিচয়ের দৃশ্যমান স্মারকগুলো যদি আমরা রক্ষা না করি, তবে ইতিহাস একদিন আমাদের ক্ষমা করবে না। চলুন, অন্তত মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ ও তাদের স্মৃতিচিহ্নের প্রতি সম্মান রেখে চলি।
মন্তব্য করুন