মোঃ রাতুল হাসান লিমন
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সহিংসতা ও বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ভারত–বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন করে চাপে পড়েছে। দুই দেশের মধ্যে আগে থেকেই থাকা কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবার আরও গভীর হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
উত্তর বাংলাদেশের ময়মনসিংহে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্য ও পোশাকশ্রমিক দীপু চন্দ্র দাস (২৭) হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ শুরু হয়। এই ঘটনার জেরে নয়াদিল্লি ও ঢাকার সম্পর্কের অবনতির বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় ছাত্রনেতা শরিফ ওসমান হাদী হত্যার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংস বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এরই মধ্যে ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে একটি উত্তেজিত জনতা পিটিয়ে হত্যা করে বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
হাদী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ দাবি করে, মূল সন্দেহভাজন ব্যক্তি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং তিনি ভারতে পালিয়ে গেছেন। যদিও বাংলাদেশ পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তের দেশত্যাগের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব জোরালো হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে ভারতে হিন্দু সংগঠনগুলোর প্রতিবাদ কর্মসূচি দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে উভয় দেশই বিভিন্ন শহরে ভিসা কার্যক্রম সীমিত করেছে এবং একে অপরের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের তলব করে দূতাবাস ও কনস্যুলেটের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাস বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির এবং এতে দুই দেশের সম্পর্ক কোন দিকে যাবে, তা বলা কঠিন। তিনি উভয় পক্ষকে সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব নতুন নয়। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে অগ্রগতি না থাকায় এই ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
সম্প্রতি ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের দিকে মিছিল ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনের ভবনে হামলার ঘটনাও ঘটে। পরে কয়েকজনকে আটক করা হলেও মামলা ছাড়াই তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে একটি হিন্দু সংগঠনের বিক্ষোভকে ‘অযৌক্তিক’ বলে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, দুই দেশের মধ্যে এমন অবিশ্বাস ও সন্দেহ এর আগে দেখা যায়নি। তিনি কূটনৈতিক স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উভয় দেশের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর জোর দেন।
দীপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু ও নাগরিক সমাজের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো গত এক বছরে দেশে সংঘবদ্ধ সহিংসতা বাড়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জানিয়েছে, সহিংসতার কোনো স্থান নতুন বাংলাদেশে নেই এবং এ ঘটনায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কিছু উগ্র গোষ্ঠী ভিন্নমত দমনে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ‘ভারতপন্থি’ আখ্যা দিয়ে হামলার বৈধতা তৈরি করছে। এর জেরে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সামাল দেওয়া তুলনামূলক সহজ হবে।
তবে ততদিন পর্যন্ত উভয় দেশের নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান—রাস্তায় উত্তেজনা বাড়তে না দিয়ে কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া।
মন্তব্য করুন