মোঃ নাইম মিয়া
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি ত্বরান্বিত হলেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তার ২৩৭টি আসনের প্রাথমিক তালিকায় কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস) আসনটি খালি রেখেছে। এই সিদ্ধান্তে আসনের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের মধ্যে কন্দল ছড়িয়ে পড়েছে, যা দলীয় ঐক্যের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। মিত্রদলের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির আলোচনা এবং হাইকোর্টের রিটের অনিশ্চয়তা ছাড়াও, আসনটিতে অর্ধেক ডজনেরও বেশি নেতার মনোনয়নের দৌড় এবং তাদের মধ্যে সমর্থনের বণ্টনই এই বিলম্বের মূল কারণ বলে স্থানীয় বিশ্লেষকরা মত প্রকাশ করছেন।
বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে গতকাল (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তালিকা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, "এটি প্রাথমিক তালিকা। দলের স্বার্থ রক্ষায় যেকোনো সময় সংশোধনী আসতে পারে।" কিন্তু কুমিল্লা-২ আসনের ক্ষেত্রে এই 'সংশোধনী' কতদিনের ব্যাপার, তা স্পষ্ট হয়নি। দলীয় সূত্র জানায়, মোট ৬৩টি খালি আসনের (কুমিল্লা-২ সহ) প্রায় ৪০টি মিত্রদলগুলোর—যেমন জাতীয় নাগরিক পার্টি (জাতীয়), ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) এবং কয়েকটি ইসলামপন্থী দলের—জন্য রিজার্ভ করা হয়েছে। এই আলোচনা চূড়ান্ত না হওয়ায় আসনগুলো খালি রাখা হয়েছে।
আসন পুনর্বিন্যাসের জটিলতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কুমিল্লা-২ আসনে হোমনা-তিতাস উপজেলা ছাড়াও মেঘনা উপজেলার অংশ যুক্ত হয়েছে, যা হাইকোর্টে তিনটি রিট পিটিশনের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। এই রিটগুলোর ফলাফল না আসায় প্রার্থী মনোনয়ন স্থগিত রয়েছে। স্থানীয় বিএনপি নেতা এবং কুমিল্লা উত্তর জেলা আহ্বায়ক মোঃ আক্তারুজ্জামান সরকার বলেন, "হাইকোর্টের রায় না আসায় আমরা অপেক্ষায় আছি। কিন্তু এতে নির্বাচনী প্রচারণা বিলম্বিত হচ্ছে, এবং কর্মীরা হতাশ হয়ে পড়ছেন।" তিনি যোগ করেন, সাবেক এমপি এম.কে. আনোয়ারের মৃত্যুর পর আসনটিতে শক্তিশালী নেতৃত্বের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
অভ্যন্তরীণ কন্দল এই অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। আসনে ছয়জনেরও বেশি নেতা মনোনয়নের দৌড়ে রয়েছেন, এবং তাদের মধ্যে সমর্থনের বণ্টন এলোমেলো। দলের নীতি অনুসারে এক পরিবার থেকে একাধিক প্রার্থী না রাখার কারণে কয়েকটি দাবি খারিজ হয়েছে। নীচে আসনের প্রধান দাবিদার নেতাদের অবস্থা এবং স্থানীয় কমর্কীদের সমর্থনের সংক্ষিপ্ত ছবি তুলে ধরা হলো:
- *ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন*: জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং সাবেক মন্ত্রী। তিনি দ্বৈত আসন (কুমিল্লা-১ ও -২) থেকে প্রার্থী হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে সাম্প্রতিক সক্রিয়তা কম, যদিও দলীয় হাইকমান্ডের সমর্থন তার পক্ষে। স্থানীয় কমর্কীরা তার 'ক্লিন ইমেজ' এবং মন্ত্রীপদের সম্ভাবনায় উৎসাহিত, কিন্তু ৪০% এরও কম সমর্থন পেয়েছেন বলে সূত্র জানায়।
- *মোঃ আক্তারুজ্জামান সরকার*: কুমিল্লা উত্তর জেলা আহ্বায়ক এবং তিনবারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। তিনি লিফলেট বিতরণ, দুর্গাপূজা পরিদর্শন এবং গণসংযোগে সক্রিয়। সাংগঠনিকভাবে সবচেয়ে এগিয়ে, এবং ৫০% এরও বেশি কমর্কীর সমর্থন তার পক্ষে। তবে, মিত্রদলের আলোচনায় তার দাবি প্রভাবিত হতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে।
- *ইঞ্জিনিয়ার এম এ মতিন খান*: সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এপিএস-২ সচিব। সামাজিক অনুষ্ঠান এবং ফেসবুক প্রচারে সক্রিয়, চাকরি-উপকারের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করছেন। গ্রহণযোগ্যতা উচ্চ, এবং কমর্কীরা তার 'বিজয় অপ্রতিরোধ্য' মনে করেন। সমর্থনের হার প্রায় ৩৫%, কিন্তু অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবস্থান দুর্বল।
- *ড. খন্দকার মারুফ হোসেন*: ড. মোশাররফের পুত্র এবং জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। সাংগঠনিক কাজে যুক্ত, কিন্তু উত্তরাধিকারভিত্তিক দাবির কারণে কমর্কীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সমর্থন মাত্র ২০% এর কাছাকাছি, এবং পরিবারীয় নীতির কারণে তার দাবি খারিজ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
- *মোঃ সেলিম ভূইয়া*: বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। আসন পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন এবং গণসংযোগ বাড়াচ্ছেন। সাংগঠনিক সমর্থন ভালো (৩০% এর কাছাকাছি), কিন্তু আসন পরিবর্তনের জটিলতায় তার অবস্থান বিপাকে পড়েছে।
- *এ্যাড. আজিজুর রহমান মোল্লা*: হোমনা উপজেলা সাবেক সাধারণ সম্পাদক। ফেসবুক প্রচার এবং ক্লিন ইমেজের দাবিতে সক্রিয়। লোকাল কমর্কীদের মধ্যে তীব্র সমর্থন (২৫%), এবং তিনি বলেন, "আসন পুনরুদ্ধারের বিকল্প নেই, আমি প্রস্তুত।"
- *মাকসুদা আক্তার রিমা*: ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। কবর জিয়ারত এবং লিফলেট বিতরণে যুক্ত। নারী প্রার্থী হিসেবে ছাত্র কমর্কীদের শক্তিশালী সমর্থন (২৫% এর কাছাকাছি), কিন্তু সামগ্রিকভাবে দাবি দুর্বল।
এই নেতাদের মধ্যে সমর্থনের বণ্টন এলোমেলো হওয়ায় কেন্দ্রীয় কমিটি সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছে। একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলীয় নেতা বলেন, "একাধিক দাবিদারের কারণে কন্দল বেড়েছে। ক্লিন ইমেজের একজনকে মনোনয়ন করলে বিজয় নিশ্চিত, কিন্তু বিলম্বে কর্মীরা বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারেন।"
স্থানীয় কমর্কীদের মধ্যে এই স্থগিতকরণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আসনের মোট ভোটার ৩ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি, এবং এটি বিএনপির ঐতিহ্যবাহী দুর্গ। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতেও মিত্রদলের সঙ্গে সমন্বয় না হলে চ্যালেঞ্জ বাড়বে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে শীতবস্ত্র বিতরণ এবং খেলাধুলার মাধ্যমে গণসংযোগ বাড়ানো হলেও, মনোনয়ন না হলে এগুলো ব্যর্থ হতে পারে। একজন কমর্কী বলেন, "বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা ৭০% এরও বেশি, কিন্তু এই বিলম্বে জামাতের হাতে চলে গেলে ক্ষতি হবে।"