ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঝিনাইদহ জেলার চারটি আসনে ভোটের রাজনীতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। ধানের শীষের ঐতিহ্যবাহী ঘাঁটিতে জামায়াতের সংগঠিত উপস্থিতি এবং হারানো আসন পুনরুদ্ধারে বিএনপির মরিয়া প্রচেষ্টায় জেলার রাজনৈতিক মাঠে তৈরি হয়েছে তীব্র উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা। আওয়ামী লীগ নির্বাচনী মাঠে না থাকায় এবারের নির্বাচনে ঝিনাইদহে মূলত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই সরাসরি লড়াই গড়ে উঠেছে।
প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা আরও জোরালো হয়েছে। গ্রামগঞ্জে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাওয়া, উঠান বৈঠক, মাইকিং ও লিফলেট বিতরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনাও দৃশ্যমান হচ্ছে। কোথাও কোথাও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠছে, যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নজরদারির কথা জানানো হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঝিনাইদহের চারটি আসনেই নতুন ও তরুণ ভোটারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রায় ৯৫ হাজার নতুন ভোটার এবারের নির্বাচনে যুক্ত হয়েছেন, যারা প্রচলিত ভোটের হিসাব পাল্টে দিতে পারেন। এই তরুণ ভোটারদের মন জয় করতেই প্রার্থীরা কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
ঝিনাইদহ-১: বিএনপি পুনরুদ্ধারের চেষ্টায়, জামায়াতের শক্ত চ্যালেঞ্জ
শৈলকুপা উপজেলা নিয়ে গঠিত ঝিনাইদহ-১ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ২৫ হাজার ২৭৮ জন। অতীতের নির্বাচনী ইতিহাসে আওয়ামী লীগের আধিপত্য থাকলেও এবারে সেই সমীকরণ ভেঙে গেছে। বিএনপির প্রার্থী সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামানকে ঘিরে দলীয় নেতাকর্মীরা আশাবাদী। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের দাবি, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও সামাজিক নেতৃত্বের কারণে তিনি এগিয়ে আছেন।
অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী আবু ছালেহ মো. মতিউর রহমান নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে শক্ত অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছেন। দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, হামলা ও হুমকির বিষয়েও বক্তব্য আসছে, যা নির্বাচনকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে।
ঝিনাইদহ-২: বিএনপির ঘাঁটিতে নীরব জামায়াতের অগ্রযাত্রা
ঝিনাইদহ সদর ও হরিণাকুণ্ডু উপজেলা নিয়ে গঠিত ঝিনাইদহ-২ আসনকে জেলার রাজনৈতিক কেন্দ্র বলা হয়। এখানে মোট ভোটার ৫ লাখ ৬ হাজার ৬৪০ জন। বিএনপির প্রার্থী আব্দুল মজিদকে দলীয়ভাবে এগিয়ে রাখা হলেও জামায়াত প্রার্থী আলী আজম মোহাম্মদ আবু বকর নীরবে সাংগঠনিক শক্তি বাড়াচ্ছেন। বিশেষ করে নারী ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের সক্রিয় প্রচারণা বিএনপির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
দলীয় ঐক্য বজায় রাখতে পারলে বিএনপি এগিয়ে থাকবে বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতারা। তবে ভেতরের মতবিরোধ নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে।
ঝিনাইদহ-৩: পুরনো ঘাঁটি ধরে রাখার লড়াই
এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৩৩ হাজার ১৫ জন। বিএনপির প্রার্থী মেহেদী হাসান রনিকে ঘিরে দলীয় কর্মীরা সক্রিয় থাকলেও জামায়াত প্রার্থী মতিয়ার রহমান পরিবর্তনের বার্তা দিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন। ভোটের শেষ মুহূর্তে এই আসনেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে।
ঝিনাইদহ-৪: বিদ্রোহী প্রার্থীতে জটিল সমীকরণ
কালীগঞ্জ ও আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত ঝিনাইদহ-৪ আসনে ত্রিমুখী লড়াই সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। বিএনপির প্রার্থী রাশেদ খান, জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা আবু তালিব এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজের উপস্থিতিতে ভোটের অঙ্ক জটিল হয়ে উঠেছে। মোট ৩ লাখ ৩০ হাজার ৪৬৪ ভোটারের এই আসনে সামান্য ভোট বিভাজনেই ফল পাল্টে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রশাসনের প্রস্তুতি
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুউদ জানিয়েছেন, ঝিনাইদহে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা, ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনী মাঠে ঝিনাইদহে এবারের নির্বাচন শুধু আসন জয়ের লড়াই নয় এটি রাজনৈতিক শক্তির পুনর্বিন্যাস ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণের একটি বড় পরীক্ষা হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।