বাংলাদেশে শিক্ষকতা পেশার প্রতি আগ্রহ দিন দিন কমে আসছে। কম বেতন, সামাজিক মর্যাদা হ্রাস, চাকরির নিরাপত্তাহীনতা এবং রাজনৈতিক ও স্থানীয় চাপ এই পেশাকে অনেকের কাছে কম আকর্ষণীয় করে তুলছে। নিয়োগে অনিয়ম, পদোন্নতির সংকট এবং অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজ শিক্ষকদের কাজের চাপ আরও বাড়াচ্ছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীর শৃঙ্খলাহীনতা, অভিভাবকের অসহযোগিতা এবং মানসিক চাপও শিক্ষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবসর সুবিধা দুর্বল, তুলনামূলক কম সুযোগ-সুবিধা এবং সময়মতো বেতন না পাওয়া শিক্ষকদের হতাশা আরও বৃদ্ধি করছে।
এছাড়া ইনক্রিমেন্ট অনিশ্চিত, এমপিও জটিলতা, বদলি নীতির অস্পষ্টতা এবং গভর্নিং বডির হস্তক্ষেপ পেশার স্বতন্ত্রতা হ্রাস করছে। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, মূল্যায়নে স্বচ্ছতার অভাব এবং গবেষণার সুযোগ সীমিত থাকাও শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করছে।
শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের চাপ, প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাব, শ্রেণিকক্ষের অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশ এবং নারী শিক্ষকদের বাড়তি ঝুঁকিও পেশাটিকে কম আকর্ষণীয় করছে। পাশাপাশি কর্মঘণ্টার অঘোষিত বৃদ্ধি, সামাজিক দায়বদ্ধতার চাপ, শিক্ষক সুরক্ষা আইনের দুর্বলতা এবং পেশাগত পরিচয়ের অবমূল্যায়ন শিক্ষকদের মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে।
সরকারি–বেসরকারি ব্যবধান, পদ সৃষ্টি না হওয়া, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট, কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি না থাকা এবং উচ্চশিক্ষার ছুটি জটিলতা নতুন প্রজন্মের শিক্ষকদের মধ্যে এই পেশার প্রতি আগ্রহ হ্রাস করছে। বিদেশে প্রশিক্ষণের সুযোগ কম, পাঠ্যবই বিতরণ জটিলতা, অপ্রাসঙ্গিক নির্দেশনা এবং হঠাৎ নীতিমালা পরিবর্তনও সমস্যার মূল কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অভিযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা, কর্মস্থলে মত প্রকাশের সীমাবদ্ধতা, অতিরিক্ত পড়ানোর চাপ, ফলাফলনির্ভর মূল্যায়ন, প্রশাসনের একমুখী সিদ্ধান্ত এবং পেশাগত স্বাধীনতার অভাব শিক্ষকতার প্রতি আগ্রহ হ্রাসের অন্যতম কারণ। শিক্ষক সমাজের ঐক্যের ঘাটতি, আইনগত সহায়তার অভাব, সম্মানজনক অবসর জীবনের নিশ্চয়তা না থাকা, দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার পরিকল্পনার অভাব, নৈতিক হতাশা এবং পেশা বদলের সীমিত সুযোগ এই পেশাকে অনেকের কাছে অপ্রিয় করে তুলছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শিক্ষকতার পেশার প্রতি সঠিক মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং সুযোগ-সুবিধা না দিলে ভবিষ্যতে দেশের শিক্ষা খাতে গুণগত মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে যাবে।