মৌলভীবাজার, ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) আয়োজিত নির্বাচনকালীন সাংবাদিকতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী নির্বাচনে ‘বৈষম্য ও স্বচ্ছতার অভাবের’ অভিযোগ তুলে মৌলভীবাজার জেলা সাংবাদিক ইউনিয়ন রোববার অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে।
সকাল থেকে সংগঠনটির সভাপতি জাফর ইকবাল-এর নেতৃত্বে সাংবাদিকরা মৌলভীবাজার সার্কিট হাউসের প্রশিক্ষণস্থলের পাশেই শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান নেন। তাদের অভিযোগ, শ্রম অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধনপ্রাপ্ত সংগঠন হওয়া সত্ত্বেও মৌলভীবাজার জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নকে শুরুতে অংশগ্রহণকারী তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
আয়োজন ও অংশগ্রহণে অস্পষ্টতা
পিআইবির আয়োজনে ৪ ও ৫ জানুয়ারি দুই দিনব্যাপী এই কর্মশালায় মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার সাংবাদিকরা অংশ নেন। মোট অংশগ্রহণকারী ছিলেন ৫১ জন। চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী মৌলভীবাজার জেলা থেকে ৪১ জন এবং হবিগঞ্জ জেলার ১০ জন। তবে কোন জেলা বা সংগঠন থেকে কতজন অংশ নেবেন—সে বিষয়ে আগাম কোনো স্পষ্ট নীতিমালা বা সমন্বয়ের অভাব ছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
অবস্থান কর্মসূচির পর সুযোগ
অবস্থান কর্মসূচির পরিপ্রেক্ষিতে মৌলভীবাজার জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের ছয়জন সদস্যকে কর্মশালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সংগঠনটির সভাপতি জাফর ইকবাল জানান, ভবিষ্যতে ঢাকায় আরও ১০ জন সাংবাদিককে প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হবে—এমন আশ্বাসও তারা পেয়েছেন।
তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে সরকারি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে আমাদের সংগঠনকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হওয়ায় বাধ্য হয়েই আমরা অবস্থান কর্মসূচিতে নেমেছি।”
প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে সমন্বয়ের অভাবের অভিযোগ
মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম শেফুল বলেন, “সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে অংশগ্রহণকারীদের তালিকা চূড়ান্ত করা হলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। আমাদের সঙ্গে কোনো ধরনের সমন্বয় না করেই কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, কর্মশালায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়া সাংবাদিকদের তালিকা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এটি পেশাগত পরিবেশের জন্য বিব্রতকর।
সিলেটেও অনুরূপ অভিযোগ
একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে সিলেটেও। সেখানে সিলেট প্রেসক্লাবে পিআইবির আয়োজনে নির্বাচনকালীন সাংবাদিকতা বিষয়ক কর্মশালাকে সিলেট জেলা প্রেসক্লাব বর্জন করেছে বলে জানা গেছে। অংশগ্রহণকারী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বৈষম্যের অভিযোগ তুলে স্থানীয় সাংবাদিক নেতারা কর্মশালাটি প্রত্যাখ্যান করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সহসভাপতি শহিদুল ইসলাম সরকার অবস্থান কর্মসূচির প্রতি সংহতি প্রকাশ করে পিআইবির প্রশিক্ষণে বৈষম্যের তীব্র নিন্দা জানান।
মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এস এম মেহেদী হাসান বলেন, “রাষ্ট্রীয় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের আয়োজন করা কর্মশালায় স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও পেশাগত মানদণ্ড নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।” তাদের অভিযোগ, প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিকদের বাদ দিয়ে এমন কিছু ব্যক্তিকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যাদের সাংবাদিকতার সঙ্গে সক্রিয় সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
পিআইবি বা মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক কোন বক্তব্য নেই
এই বিষয়ে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) বা তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রশিক্ষণের লক্ষ্য বনাম বাস্তবতা : নির্বাচনকালীন সাংবাদিকতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালাগুলো সাধারণত ভোটের সময় দায়িত্বশীল, নিরপেক্ষ ও পেশাদার সংবাদ পরিবেশ নিশ্চিত করার মহৎ লক্ষ্যে আয়োজন করা হয়। কিন্তু যখন অংশগ্রহণকারী বাছাইয়েই স্বচ্ছতা, সমন্বয় ও ন্যায্যতার বালাই থাকে না, তখন প্রশ্ন ওঠে বৈধতা নিয়েই। এমন অভিযোগ শুধু একটি কর্মশালার সাফল্যকেই নয়, জাতীয় নির্বাচনের মতো একটি গুরুদায়িত্বের প্রস্তুতিতে সাংবাদিকদের জন্য তৈরি করা এই ধরনের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্যকেই বিঘ্নিত করে। একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যমের ভূমিকা নিশ্চিত করতে চাইলে, প্রথম শর্তই হচ্ছে গণমাধ্যম কর্মীদের প্রতি সম্মান ও ন্যায্য আচরণ নিশ্চিত করা। অন্যথায়, প্রশিক্ষণ নয়, বিভাজন ও অবিশ্বাসের বীজই বপন হয়, যা গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
মন্তব্য করুন