
ইরি অতনু
বিকেলের তপ্ত রোদ তখন মরে এসেছে। কুষ্টিয়ার রেনউইক বাঁধের ধারে গড়াই নদীর বাতাসে স্নিগ্ধতা। বন্ধু-বান্ধবের সাথে আড্ডা দিতে দিতেই হঠাৎ সৌরভের চোখ আটকে গেল। বকুল গাছের তলায় দাঁড়িয়ে এক তরুণী। পরনে হালকা নীল শাড়ি, খোলা চুলে বাতাসের খেলা। সৌরভের মনে হলো, পুরো পৃথিবীটা থমকে দাঁড়িয়েছে। সেই মুহূর্তে তার মনে যে হিল্লোল বয়ে গেল, তা যেন অকাল বসন্তের এক দমকা হাওয়া।
সৌরভ সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের শান্ত ছেলে। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের মায়া তাকে এমনভাবে গ্রাস করল যে, সে পড়াশোনা-ঘরবাড়ি সব ভুলে ওই পার্কের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেল। মেয়েটি প্রতিদিন বিকেলে তার বান্ধবীদের নিয়ে পার্কে আসে, ফুচকা খায়। তাকে কাছ থেকে দেখার জন্য সৌরভ এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসল। পার্কের মোড়ের ফুচকাওয়ালার সাথে খাতির জমিয়ে সে নিজেই ফুচকা বানানো শুরু করল।
সৌরভ জানত, নাম না জানলে এই ভালোবাসা অপূর্ণ। একদিন ফুচকা দিতে গিয়েই জানল—নাম তার অহনা। অহনাও খেয়াল করেছিল এই অদ্ভুত ফুচকাওয়ালাকে, যার চোখে একরাশ স্বপ্ন আর মমতা। বন্ধুত্ব থেকে প্রেম হতে বেশি সময় লাগেনি। কুষ্টিয়ার সেই ছোট শহর সাক্ষী থাকল এক পবিত্র প্রেমের।
সময় বয়ে যায় আপন গতিতে। দেখতে দেখতে সাতটি বছর কেটে গেল। সৌরভ এখন কুষ্টিয়ার এক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র। এই সাত বছরে অহনার সাথে তার সম্পর্কটা কেবল আবেগ নয়, অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে সৌরভের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হয়ে ওঠে সোহান। সোহান স্মার্ট, বাকপটু এবং কিছুটা উচ্চাভিলাষী।
সৌরভ সরল বিশ্বাসে সোহানকে তার সাত বছরের প্রেমের গল্প শোনায়। একদিন অহনার সাথে সোহানের পরিচয় করিয়ে দেয়। কিন্তু সেই পরিচয়ই যে কাল হয়ে দাঁড়াবে, তা সৌরভ ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। অহনাকে প্রথম দেখেই সোহানের ভেতরে এক বিষাক্ত লালসা আর ঈর্ষা জন্ম নেয়। সে মনে মনে ভাবল, "সৌরভের মতো সাধারণ ছেলের পাশে এত সুন্দরী মেয়ে মানায় না।"
সোহান জানত, সরাসরি আক্রমণ করলে কাজ হবে না। সে শুরু করল সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক খেলা। সে জানত বর্তমান সময়ে তরুণ-তরুণীদের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা কোথায়—সন্দেহ আর ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তা।
সে অহনার কাছে গিয়ে সৌরভের নামে বানিয়ে বানিয়ে কথা বলতে শুরু করল। কখনো রাজনীতির দোহাই দিয়ে বলল, "সৌরভ ক্যাম্পাসে নোংরা রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ছে, ওর ক্যারিয়ার শেষ।" কখনো আবার কোনো এক কাল্পনিক মেয়ের নাম করে বলল, "সৌরভ আজকাল অমুক মেয়ের সাথে মেলামেশা করছে, আমি বন্ধু হিসেবে তোকে সতর্ক করছি।"
সোহান অত্যন্ত চতুরতার সাথে কিছু ভুয়া মেসেজ আর এডিট করা ছবি তৈরি করল। অহনা প্রথমে বিশ্বাস করতে চায়নি, কিন্তু সোহানের বারবার বলা "শুভাকাঙ্ক্ষী"সুলভ কথাগুলো তার মনে বিষ ঢেলে দিল। সৌরভ লক্ষ্য করল, অহনা ইদানীং খুব খিটখিটে হয়ে গেছে। কথা বললেই ঝগড়া বাধে।
অহনা একদিন কাঁদতে কাঁদতে বলল,
"সৌরভ, আমি কি তোকে চিনতে ভুল করেছি? রাজনীতির নেশায় বা অন্য মেয়ের মোহে তুই কি আমাদের সাত বছরের সম্পর্কটা ভুলে যাবি?"