গ্রিক স্থাপত্য শৈলীর দৃষ্টিনন্দন অনেক নিদর্শনে ভরপুর কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর। আর বহুকাল থেকেই যেন সেগুলো ভ্রমণপিপাসুদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ সৃষ্টি করছে। ঐতিহাসিক স্থাপনার পাশাপাশি প্রাকৃতিক ঐতিহ্যও রয়েছে এখানে। এ কারণে দেশি-বিদেশিদের কাছে আনন্দদায়ক পর্যটন এলাকা হিসেবে কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর বেশ সুপরিচিত। ফলে প্রতিবছরই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার ভ্রমণপিপাসু ছুটে আসেন হোসেনপুরে। জেলার প্রাচীন নিদর্শনগুলোর মধ্যে হোসেনপুর উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি ও জমিদারপুত্র মানব বাবুর বিশাল মৎস্য খামার অন্যতম। প্রতিদিনই পর্যটকদের ভিড় থাকে এখানে। জমিদারি না থাকলেও শেষ জমিদারের ছেলে শ্রী মানবেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী চৌধুরী (মানব বাবু) এখনো বেঁচে আছেন।
তিনিই বাড়িটি দেখভাল করছেন। সে সুবাদে আগত পর্যটকরা একমাত্র জীবিত জমিদার পুত্র মানব বাবুর সাথে কথা বলে জমিদারি প্রথা চালু ও বিলুপ্তির ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প,সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার মতো মনোমুগ্ধকর ঐতিহাসিক তথ্য জানার স্বাদ মিটাতে পারছেন।
জানা গেছে, জমিদারের সবশেষ বংশধর মানব বাবু বাড়িটিতে বসবাস করায় এটি এলাকায় মানব বাবুর বাড়ি হিসেবেই পরিচিত। ঐতিহাসিক নিদর্শন ও জমিদার পরিবারের সদস্যের সাথে দেখা করার সুযোগ পেয়ে মহাখুশি ও মুগ্ধ হচ্ছেন আগত দর্শনার্থীরা।
স্থানীয় ইতিহাসবিদ ও হোসেনপুর আদর্শ মহিলা ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এম এ হাকিমসহ অনেকেই জানান, দীননাথ চক্রবর্তীর পূর্বপুরুষরা ছিলেন ব্রাহ্মণ গোত্রের শাস্ত্রীয় পণ্ডিত। তারা ১৬ শতকের দিক থেকে বর্তমান জমিদার বাড়ির দক্ষিণে শিব মন্দিরে বসতি শুরু করেন। ১৮ শতকের শেষ দিকে দীননাথ চক্রবর্তীর হাত ধরে বর্তমান এ বাড়িটির যাত্রা শুরু হয়। তিনিই ইংরেজদের কাছ থেকে হোসেনশাহী পরগণার কিছু অংশ ক্রয় করে প্রথম জমিদারি শুরু করেন।
পরবর্তীতে বাবু অতুল চক্রবর্তী ‘পত্তনি’সূত্রে আঠারো বাড়ির জমিদার জ্ঞানদা সুন্দরী চৌধুরাণীর কাছ থেকে গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি অন্তর্ভূক্ত করেন। ইংরেজ শাসনামলে ওই এলাকার মানুষ শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্য সাধনায় বিশেষ উন্নতি লাভ করেছিল। প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন এ জমিদার বাড়িটি ১৮ শতকের গ্রিক স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত। দৃষ্টিনন্দন কারুকার্যময় বাড়িটিতে রয়েছে কাচারি ঘর, নহবতখানা, দরবারগৃহ ও মন্দির, যা ঘিরে রয়েছে চারদিকে সুউচ্চ প্রাচীর। বাড়ির সামনে রয়েছে সবুজে ঘেরা বিশাল বাগান ও পুকুর, যা ৯.৮৫ একর জায়গা নিয়ে অবস্থিত।
এ ছাড়াও বাড়ি থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে রয়েছে সুবিশাল নয়নাভিরাম মাছ চাষাবাদের ব্যবস্থা, যা পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে।
সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহকালে ওই জমিদার বাড়িতে কথা হয় জমিদারপুত্র শ্রী মানবেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সাথে। তিনি জানান, ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতার কাঞ্জপুঞ্জ থেকে রাজা আদিশূরের সময়ে বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার দীননাথ চক্রবর্তীর পূর্বপুরুষ ছিলেন ব্রাহ্মণ গোত্রের শ্রী ভূপতিনাথ চক্রবর্তী চৌধুরী। তিনি শাস্ত্রীয় পণ্ডিত ছিলেন। পূজার জন্য পুরোহিত ব্রাহ্মণ হিসেবে ধর্মকর্ম করতে এসে এখানেই বসতি স্থাপন করেন তিনি। পরে ব্রিটিশদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকার বিনিময়ে জমিদারির কিছু অংশ ক্রয় করে নেন তিনি।
ব্রিটিশরা তখন স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে জমিদারি প্রথা চালু করেন। এরই অংশ হিসেবে জমিদারগণ খাজনা আদায় করে তা নিয়মিত পরিশোধ করে জমিদারি টিকিয়ে রাখতেন। তখন ব্রিটিশদের সূর্ষাস্ত্র আইনের কারণে তিন বছরের বেশি সময়ের খাজনা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে জমিদারি বিলুপ্ত হয়ে যেত। যে কারণে জমিদাররা প্রজাদেরকে অত্যাচার-নির্যাতন করে হলেও খাজনা দিতে বাধ্য হতেন। সে সময়ে জমি চাষের জন্য কোনো লোকবলও পাওয়া যেত না। ওই সময়ে গরুসহ জমি দিয়ে লাঙ্গল-জোয়াল নিয়ে হেঁটে গেলেও তাকে জমি চাষে বাধ্য করা হতো। ব্রিটিশদের এ সব অত্যাচারের কারণেই জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি হয়।
কাজেই এখন আর কেউ জমিদার নাই।
এ ব্যাপারে এলাকাবাসী জানান, বর্তমানে জমিদারি প্রথা না থাকলেও ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গাঙাটিয়া জমিদার বাড়ি ও জমিদারপুত্র মানব বাবুর বিশাল পুকুর। যা নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানার সুযোগ করে দিচ্ছে। পাশাপাশি গ্রিক স্থাপত্য শৈলীর দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাগুলোও দূর-দূরান্ত থেকে আসা
লোকজনকে দিচ্ছে কল্পনাতীত আনন্দ।যে কারণে জেলার মধ্যে এটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান হিসেবে বর্তমানে সমুধিক পরিচিতি লাভ করেছে।
মন্তব্য করুন