আজিজুর রহমান
রাষ্ট্রীয় নথি জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক নীরবতার এক ভয়ংকর দৃষ্টান্ত উঠে এসেছে যশোরের চৌগাছা উপজেলার ২ নম্বর পাশাপোল ইউনিয়নে। অভিযোগ রয়েছে, জাল জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহার করে প্রায় দেড় দশক ধরে চাকরি করে যাচ্ছেন দুই গ্রাম পুলিশ। এ নিয়োগের পেছনে তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহিনুর রহমান ও সচিব ইবাদত হোসেনের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। বিনিময়ে নেওয়া হয়েছে মোটা অঙ্কের ঘুষ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১১ সালে পাশাপোল ইউনিয়নে অস্থায়ী ভিত্তিতে ৫ জন গ্রাম পুলিশ নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পহেলা নভেম্বরের একটি চিঠির পর উপজেলা গ্রাম পুলিশ নিয়োগ কমিটির ১৫ ডিসেম্বর ২০১১ সালের সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। পরে ২২ জানুয়ারি ২০১২ সালের নির্দেশনায় এই নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়, যা কার্যকর হয় ১ ফেব্রুয়ারি ২০১২ থেকে।
নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী প্রার্থীদের বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও নাগরিক পরিচয়ের বৈধতা যাচাই করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি বলে অভিযোগ। বরং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করা জন্মনিবন্ধন সনদ ও ভোটার আইডি কার্ডে ভয়াবহ অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।
নিয়োগপত্রে রফিকুল ইসলামের জন্মতারিখ উল্লেখ করা হয় ৩০ ডিসেম্বর ১৯৯৬। অথচ তার জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ ১ জানুয়ারি ১৯৭৯। অর্থাৎ কাগজে বয়স কমিয়ে তাকে চাকরির যোগ্য দেখানো হয়েছে। একইভাবে মোঃ মকবুল হোসেনের নিয়োগপত্রে জন্মতারিখ ২০ অক্টোবর ১৯৮৪ দেখানো হলেও তার ভোটার আইডি কার্ডে জন্মতারিখ ১২ জুন ১৯৬৩—যা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে রাষ্ট্রীয় নথি জালিয়াতির বিষয়টি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব জাল সনদ তৎকালীন চেয়ারম্যান শাহিনুর রহমানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে তৈরি করা হয়। বিনিময়ে নেওয়া হয় বিপুল অঙ্কের অর্থ। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় ওই সময় কেউ এই অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পায়নি। প্রশাসনও ছিল নীরব দর্শকের ভূমিকায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই দুই ব্যক্তি প্রায় ১৫ বছর ধরে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রশ্ন উঠছে, এত বছরে তাদের কাগজপত্র কেউ যাচাই করেনি কেন? স্থানীয় সরকার বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত গ্রাম পুলিশ রফিকুল ইসলাম ও মকবুল হোসেন বলেন,
“চেয়ারম্যান আমাদের কাগজপত্র জমা দিতে বলেছিলেন। আমরা দিয়েছি। কাগজে কী ছিল, তা আমরা জানি না।”
এই বক্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—তবে কি তারা শুধু সুবিধাভোগী, নাকি জালিয়াতির সক্রিয় অংশীদার?
এ বিষয়ে তৎকালীন চেয়ারম্যান শাহিনুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। স্থানীয় সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই তিনি পলাতক রয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন সচিব ইবাদত হোসেনও প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর পাশাপোল ইউনিয়নসহ পুরো চৌগাছা উপজেলায় তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে উপজেলার প্রায় সব ইউনিয়নেই গ্রাম পুলিশ নিয়োগে একই কায়দায় অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও জালিয়াতি হয়েছে।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন—

কারা এই দুর্নীতির নেপথ্যে?

কাদের ছত্রচ্ছায়ায় বছরের পর বছর রাষ্ট্রীয় চাকরি ভোগ করা হয়েছে?

তদন্ত হবে, নাকি ধামাচাপা দেওয়া হবে?
এখনই প্রয়োজন একটি স্বাধীন, উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন, জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা এবং অবৈধ নিয়োগ বাতিল। অন্যথায় প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা আরও ভেঙে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন নাগরিকরা।