মোঃ মোশারফ হোসেন
সুদান—এক সময় আফ্রিকার হৃদয়ে জীবনের সুর বাজতো, আজ সেখানে শোনা যায় শুধু মৃত্যুর আর্তনাদ আর ধোঁয়ার কালো রেখা। প্রায় দুই বছর ধরে চলমান ভয়াবহ সংঘর্ষ দেশটিকে পরিণত করেছে এক ধ্বংসস্তূপে। ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই লড়াই মূলত সুদানের সেনাবাহিনী (SAF) ও আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স (RSF)-এর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। কিন্তু এই রাজনৈতিক সংঘর্ষ এখন রূপ নিয়েছে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে—যেখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিরীহ সাধারণ মানুষ।
দারফুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে RSF-এর হাতে সংঘটিত গণহত্যা, লুটপাট ও ধর্ষণের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে—এটি কেবল একটি যুদ্ধ নয়, বরং একটি পরিকল্পিত জাতিগত নিধন। এল ফাশের শহরে সাম্প্রতিক সহিংসতায় তিন দিনের ব্যবধানে প্রায় দেড় হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে। নারী ও শিশুদের ওপর চলছে অকথ্য নির্যাতন; হাসপাতাল, স্কুল ও আশ্রয়কেন্দ্র—কোথাও নিরাপত্তা নেই।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের ফলে ইতোমধ্যে ১ কোটি ২০ লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যাদের অধিকাংশই খাদ্য, পানি ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত।
আন্তর্জাতিক মহল এই সহিংসতাকে “গণহত্যা” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষ উপদেষ্টা সতর্ক করে বলেছেন—সুদানে যা ঘটছে, তা গণহত্যার সকল সূচক বহন করছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই RSF-এর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে গণহত্যার অভিযোগ এনেছে এবং তাদের কয়েকজন নেতার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তবুও বাস্তবতা ভয়াবহ—যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় পৌঁছাতে পারছে না মানবিক সহায়তা, ত্রাণকর্মীরা জীবন ঝুঁকি নিয়ে সীমিত পরিসরে কাজ করছেন।
এই যুদ্ধ কেবল অস্ত্রের সংঘর্ষ নয়—এটি মানবতার বিরুদ্ধে এক ভয়ঙ্কর অপরাধ। এক শরণার্থী মায়ের কণ্ঠে শোনা যায়, “আমরা শুধু বাঁচতে চেয়েছিলাম, এখন সেই চাওয়াটাই পাপ।” তার শিশুটি ক্ষুধায় কাঁদছে, আর আকাশে উড়ছে ধোঁয়ার কালো মেঘ। এই মেঘ আজ শুধু সুদানের নয়—এটি সমগ্র মানবজাতির বিবেককে আচ্ছন্ন করছে।
সুদান আজ যেন এক মুমূর্ষু দেশ—যেখানে প্রতিদিন নতুন করে লেখা হচ্ছে শোকের ইতিহাস। তবুও ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কিছু মানুষ এখনও আশার আলো খুঁজে বেড়াচ্ছে, সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে আছে। তাদের আহ্বান একটাই—“আমাদের ভুলে যেও না।”
এই আহ্বান শুধু সুদানের নয়—এটি গোটা পৃথিবীর প্রতি এক মানবিক ডাক। আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তোলা এবং মানবতার পতাকা উঁচু রাখা।
সুদানের রক্তাক্ত এই অধ্যায় হয়তো ইতিহাসের এক কালো দাগ হয়ে থাকবে, কিন্তু আমরা যদি আজও নীরব থাকি, তবে ইতিহাস আমাদেরও ক্ষমা করবে না।
এখনই সময় মানবতার কণ্ঠে আওয়াজ তোলার—যাতে পৃথিবী জানে, মানুষ এখনও মানুষকে ভালোবাসতে জানে।