"আমাদের নদী পারাপারে খুব কষ্ট হয় এজন্য একটাই দাবি একটা সেতু, সব জনপ্রতিনিধিরা কথা দেয় দ্রুতই একটি সেতু উপহার দিবেন কিন্তু সরকার যায় জনপ্রতিনিধি যায় তবুও এখন পর্যন্ত কেউ কথা রাখেনি,সেজন্য আমরা এখনো রোদ বৃষ্টি ও ঝুকিপূর্ণ রশিটেনে নদী পার হচ্ছি" এমনভাবে আক্ষেপের সুরে কথাগুলো বলছিলেন স্থানীয় যুবক কৃপা রায় ও রাজু শেখ।
নদীর দুই পারে বড় দুটি গাছের সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা হয়েছে সাদা রঙের একটা রশি। তার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে নৌকায় থাকা আরেকটি রশি। সেই রশি টেনে যাত্রীদের এক পাড় থেকে আরেক পাড়ে নিয়ে যাচ্ছেন মাঝি। যুগের পর যুগ এভাবেই রশি টেনে নদী পার হচ্ছেন নড়াইলের তিনটি ইউনিয়নের মানুষ। এই চিত্র নড়াইল সদর উপজেলার মুলিয়া বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে চলা কাজলা নদীতে।
৮০ মিটার প্রশস্ত এ নদীর পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত নড়াইল সদর উপজেলার মুলিয়া, তুলারামপুর ও শেখহাটি ইউনিয়নের অন্তত ৩০ হাজার মানুষের নিয়মিত এই ঘাট পার হতে হয়। কারণ পূর্ব পাড়ে রয়েছে মুলিয়া বাজার, সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ ইউনিয়নের সকল গুরুত্বপূর্ণ অফিস। তাছাড়া মুলিয়া বাজার থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে জেলা শহর। ফলে দৈনন্দিন কাজে মুলিয়া বাজার ও জেলা শহরের যাতায়াত করতে পশ্চিম পাড়ের মানুষকে প্রতিনিয়ত এই নদী পার হতে হয়। আর নদী পার না হয়ে জেলা শহরে যেতে অতিরিক্ত ১০-১৫ কিলোমিটার পথ ঘুরতে হয়। তাছাড়াও বিভিন্ন কাজে পূর্ব পাড়ের মানুষদের যেতে হয় পশ্চিম পাড়ে। প্রতিদিন সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত হাজারো মানুষ ঝুঁকি নিয়ে রশি টানা নৌকায় এই নদী পার হন। এভাবে নদী পারাপারে তাঁদের পোহাতে হয় নানা দুর্ভোগ।
গত বৃহস্পতিবার সকালে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ঘাটে একটি মাত্র নৌকা। নৌকা একপারে থাকলে, অন্যপারে যাত্রীদের ভিড় লেগে যাচ্ছে। যাত্রীদের মধ্যে স্কুলকলেজের শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চাকুরিজীবীসহ রয়েছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। নৌকার জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাঁদের। চাকুরিজীবী অনেকেই মোটরসাইকেল নিয়ে এসেছেন। ঘাটের অবস্থা ভালো না হওয়ায় তাঁদের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় ওঠা-নামা করতে হচ্ছে৷ একটি নৌকা ও একজন মাঝি হওয়ায় কোনো কারণে তিনি ঘাটে না থাকলে যাত্রীরা নিজেরাই রশি টেনে নদী পার হচ্ছেন।
রশি টানতে টানতে পানতিতা গ্রামের প্রবীর বর্মণ আক্ষেপ করে বলেন, বলতে বলতে আমাদের আর বলার জায়গা নেই। কত সরকার গেল, সবাই আশ্বাস দেয়। সেতু হয়ে গেল, হয়ে গেল করে আর হয় না৷ জানি না কবে এখানে সেতু হবে। নাকি আমাদের কষ্ট কষ্টই থেকে যাবে।
নদীর পশ্চিম পারের একটি কমিউনিটি ক্লিনিকে চাকরিরত নড়াইল শহরের বাসিন্দা সাগর সেন বলেন, ১৪ বছর ধরে এই ঘাট পার হয়ে শহর থেকে ক্লিনিকে যাওয়া-আসা করছি। ঝুঁকি নিয়ে মোটরসাইকেল পারাপার করতে হয়। এই ঘাট পার না হয়ে বিকল্প পথে গেলে আবার ১০ কিলোমিটার ঘুরতে হয়।
এলাকাবাসী বলেন, এই ঘাট পার হয়ে প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী মুলিয়াসহ জেলা শহরের বিভিন্ন স্কুলকলেজ যায়।কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদেরও ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় পার হতে হয়। ঘাটে এসে তাঁদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এতে সময়ের অপচয় হয়। রোগীদের হাসপাতালে নিতে আরো বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এছাড়া ঘর-বাড়ি নির্মাণসহ যে-কোনো প্রয়োজনে মালামাল আনা-নেয়ায় বিড়ম্বনার শেষ নেই৷
নদীর পশ্চিম পাড়ের শিক্ষার্থী শ্রেয়া বিশ্বাস ও স্নেহা বর্মণ বলেন, এই নদী পার হয়ে প্রতিদিন তাঁরা স্কুল ও প্রাইভেট পড়তে যায়। ফলে দিনে চার-পাঁচ বার ঘাট পার হতে হয়। ঘাটে এসে নৌকা অন্য পারে থাকলে আধাঘণ্টা বসে থাকতে হয়। এ কারণে অনেকসময় সময়মতো স্কুলে ও প্রাইভেটে পৌঁছাতে পারি না। তাছাড়া বৃষ্টির সময় ঘাট পিচ্ছিল হয়ে যায়, সেসময় চলাচল করতে ভয় হয়। এখানে একটি সেতু হলে
এলাকাবাসী বলেন, বিভিন্ন সময় জনপ্রতিনিধিসহ প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। একটি সেতু পুরো এলাকার চিত্র বদলে দেবে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হলে এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটবে। তাই দ্রুত এখানে একটি সেতু নির্মাণ প্রয়োজন।
মিন্টু সরকার নামে স্থানীয় এক স্কুল শিক্ষক বলেন, জনপ্রতিনিধিরা আমাদের এখানে ব্রিজের আশ্বাস দিয়েই যাচ্ছে। কিন্তু আমরা এখনও পর্যন্ত সেতুর দেখা পাই নাই৷ একটি সেতু হলে মানুষের ভোগান্তি কমবে, সহজে পারাপার হতে পারবে। তাই অতিদ্রুত এখানে একটি সেতু নির্মাণ করা হোক।
এ স্থানে সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে উল্লেখ করে নড়াইল জেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী বিশ্বজিৎ কুমার কুন্ডু বলেন, মুলিয়া বাজারের ওখানে একটি সেতুর দরকার। নদীর পাশে একটি খাল এবং বাজার থাকায় সেগুলোর ওপর দিয়ে ৪৫০ মিটারের একটি সেতু তৈরি করতে হবে। ইতিমধ্যে সেতুর একটা ডিজাইনও দাঁড় করা হয়েছে। আমরা আশা করছি, বাকি কাজ শেষে দ্রুতই সেতু নির্মাণ করতে পারব।#
মন্তব্য করুন