বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের এক আলো ছড়ানো নাম, একজন মেধাবী গবেষক, সাহিত্যিক ও ইসলামি চিন্তাবিদ তিনি প্রফেসর মোহাম্মদ মনসুর উর রহমান। পার্বতীপুরের গর্ব, বাংলা ভাষা ও ইসলামি দর্শনের অনন্য সাধক এই মানুষটি বাংলা সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় রেখেছেন তার অপরিসীম অবদান।
রংপুর কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বাংলা বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে বাংলা সাহিত্য ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিয়েছেন অসাধারণ দক্ষতায়। তবে শুধু শিক্ষকতা নয়, তিনি একজন জীবন্ত লাইব্রেরি। কোরআন শরীফের বাংলা ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ তার অন্যতম গবেষণার ক্ষেত্র। কাব্যিক রীতিতে পবিত্র কোরআনের ভাব অনুবাদ করেছেন, যা ধর্মীয় ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী প্রয়াস হিসেবে বিবেচিত।
তিনি কেবল একজন ধর্ম চিন্তাবিদই নন, লোকসাহিত্য, প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহ, শব্দের আভিধানিক বিশ্লেষণ, বাংলা শব্দের উৎপত্তি ও অর্থবিকাশ সম্পর্কেও লিখেছেন বহু মূল্যবান বই। ধর্ম, সাহিত্য ও ইতিহাসের এক অসামান্য সেতুবন্ধন তার লেখনিতে প্রতিফলিত হয়েছে।
৮২ বছর বয়সেও প্রফেসর মনসুর উর রহমান থেমে যাননি। আজও তিনি লিখে চলেছেন, গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত তিনি প্রায় ১০০টির বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যা বাংলা ভাষা ও ইসলামি ভাবধারার মেলবন্ধনে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
তবে বিস্ময়ের বিষয় এত অসামান্য অবদান সত্ত্বেও এখনো তিনি একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক বা বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের মতো কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মাননা লাভ করেননি। এটি শুধু পার্বতীপুর নয়, গোটা দেশের সাহিত্য ও শিক্ষাঙ্গনের জন্য এক গভীর বেদনার বিষয়।
প্রফেসর মনসুর উর রহমান শুধু পার্বতীপুরের নয়, তিনি বাংলাদেশের একজন জীবন্ত গৌরব। তার জ্ঞান, গবেষণা আর লেখালেখি আমাদের সাহিত্য, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে করেছে সমৃদ্ধ।
এত বছর ধরে তিনি নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন লিখেছেন শতাধিক বই, শিখিয়েছেন হাজারো শিক্ষার্থীকে, ছড়িয়ে দিয়েছেন আলোর পথ। অথচ আজও তিনি কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মান, যেমন একুশে পদক বা বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাননি যা আমাদের জন্য লজ্জার বিষয়। এই মহান মানুষটিকে আমরা যত দ্রুত সম্মান দিতে পারি, ততই সম্মানিত হবে আমাদের দেশ, আমাদের সংস্কৃতি। এখনই সময় তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়ন করার। না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একদিন আমাদের প্রশ্ন করবে এমন একজন প্রতিভাকে আমরা কেন সম্মান দিতে দেরি করেছিলাম?
প্রফেসর মুহাম্মদ মনসুর উর রহমান। ১৯৪৪ সালে দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলার আটরাই পরিবারের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম মোঃ লুৎফর রহমান এবং তার মাতা মরহুম মোছাঃ মাইছুন খাতুন। স্থানীয় নুরুলহুদা হাইস্কুল থেকে ১৯৬১ সালে কৃতিত্বের সাথে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তারপর রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক (সম্মান) ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৮ সালে পার্বতীপুর ডিগ্রি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। ১৯৭১ সালে অধ্যাপনা ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে সক্রীয় অংশগ্রহণ করেন| দেশের ভেতরে যুদ্ধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারপর ভারতে মুক্তিযুদ্ধ প্রশিক্ষণ ক্যাম্প অতিরাম ইউথ ক্যাম্পে ছাত্র সংগঠক ও মটিভেটর হিসেবে যোগ দেন এবং যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭২ সালে বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজে বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। তারপর বিভিন্ন সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। শেষে রংপুর কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে প্রফেসর ও বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত অবস্থায় অবসরগ্রহণ করেন। কৃতি শিক্ষক হিসেবে তিনি জেলা ও বিভাগ পর্যায়ে তিনবার শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের মর্যাদা লাভ করেন। তিনি একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষক হিসেবে ছাত্র শিক্ষক মহলে সমাদৃত হন। ভাষা সাহিত্য ও ধর্মীয় বিষয়ে তিনি ব্যাপক অধ্যায়ন করেন। তিনি ১৯৯৯ সালে পবিত্র হজব্রত পালন করেন।
ছাত্র অবস্থায় থেকে তিনি সাহিত্যচর্চা ও সমাজকল্যাণমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি বেশ কিছু সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত। ছাত্র অবস্থাতেই তার লেখা বিভিন্ন বিষয়ে বেশ কিছু পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে। এ যাবৎ তার লেখা বেশ কিছু গ্রন্থ ঢাকা একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে। তারমধ্যে—ভাষার ইতিহাস, ভাষা পরিক্রমা (১ম ও ২য় পর্ব), নিয়মিত শব্দরূপ, আল কুরআনের বাংলা কাব্যনুবাদ (১ম ও ২য় খণ্ড), সালাতে রসুল ও দোয়া, নবী-রাসুলগণের প্রার্থনা, কেসারি, বুদ্ধিমান বালক, ভূতের জগত প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তার অনেক ধর্মীয় সাহিত্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশনার অপেক্ষায় রয়েছে।দৈনিক জনতার খবর। দিনাজপুর জেলা প্রতিনিধিঃ মোঃ মশিউর রহমান।। তারিখ মোবাইলঃ