মোঃ সাজ্জাত হোসেন সোহান
প্রকাশঃ 24-মে-2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

‎জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন আজ

‎আজ ২৪ মে ২০২৫, মহান বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৬ তম জন্মবার্ষিকী পালন করা হচ্ছে। বাংলা সাহিত্যের এই অসামান্য ব্যক্তিত্ব শুধু শব্দের খেলোয়াড় ছিলেন না, তিনি ছিলেন স্বাধীনতা, বিদ্রোহ এবং মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক অনন্য প্রেরণার স্রোত।

‎“বিদ্রোহী কবি” নামে খ্যাত নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতা ও গানের মাধ্যমে সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী কণ্ঠস্বর তুলে ধরেছেন। মাত্র ২৩ বছরের সাহিত্যজীবনে অসংখ্য কবিতা, গান, নাটক ও গল্প রচনা করে তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি স্বর্ণালী অধ্যায় সৃষ্টি করেছেন। তাঁর মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও অদম্য সাহস আজও বাংলাভাষী মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত প্রেরণার উৎস।

‎কাজী নজরুলের কলম থেকে ঝরে পড়া বিদ্রোহ, প্রেম ও মানবতার গান আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে আজও গাঁথা। তিনি আমাদের জন্য এক অপরিমেয় অনুপ্রেরণা এবং আমাদের সংস্কৃতির এক অমর নক্ষত্র।

‎জন্ম ও শৈশব জীবন

‎কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম কাজী ফকির আহম্মদ ও মাতার নাম জাহেদা খাতুন। দারিদ্র্য ও সংগ্রামের মধ্যে বেড়ে ওঠা নজরুল ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। শিক্ষা জীবনে নানা বাধা সত্ত্বেও তিনি কুরআন, ইসলাম ধর্ম ও দর্শন শিখে নিজেকে গড়ে তোলেন।

‎শৈশবে পিতার মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে মসজিদের মুয়াজ্জিন থেকে শুরু করে লেটো গানের দলে কাজ করেন তিনি। এসব কাজে তার সঙ্গীত ও সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পায়।

‎কর্মজীবন ও সৈনিক জীবন

‎প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কাজী নজরুল ইসলাম ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯১৭ সালে তিনি ৪৯তম বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে (ইরাক ও মেসোপটেমিয়া) যুদ্ধ করেন। সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন বিভিন্ন ভাষা ও সাহিত্য শিখতে থাকেন, যা পরে তার সাহিত্যকর্মে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

‎সেনাবাহিনী থেকে ফেরার পর তিনি সাহিত্যচর্চায় মনোযোগী হন। ১৯২০ সালের দিকে তার সাহিত্য জীবন শুরু হয়। ১৯২২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’, যা বাংলা সাহিত্যে নতুন বিদ্রোহী সুরের সূচনা করে। একই বছর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশ পেয়ে তাকে ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে অভিহিত করে।

‎সাহিত্য কর্ম ও বিদ্রোহী ভাবনা

‎কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্ম বিপ্লব, সাম্যবাদ, মানবতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনায় পূর্ণ। তার কবিতা, গান ও গল্পে শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, বঞ্চনার আর্তনাদ ও মুক্তির স্বপ্ন ফুটে ওঠে। ‘বিদ্রোহী’, ‘নিস্পৃহ’, ‘পল্লীবালক’, ‘বৈরাগী’সহ অসংখ্য কবিতা সামাজিক অন্যায়, অবিচার ও শোষণের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে।

‎তিনি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ও নারীর মর্যাদার পক্ষে ছিলেন প্রবল সমর্থক। তাঁর গান ‘নজরুলগীতি’ পরবর্তীতে বাংলা সংগীতের এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। তার গানে ইসলামি, হিন্দু, পারসিক ও লোকসঙ্গীতের অনন্য মিশ্রণ পাওয়া যায়, যা বাংলার সঙ্গীত জগতকে সমৃদ্ধ করেছে।

‎সাংবাদিকতা, নাটক ও চলচ্চিত্র

‎কাজী নজরুল ইসলাম কেবল কবি ও গীতিকারই নন, তিনি ছিলেন জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সমাজ সচেতন এক সম্পূর্ণ মানুষ। তিনি ‘ধূমকেতু’, ‘নবযুগ’, ‘কিরণ’ প্রভৃতি পত্রিকার সম্পাদক ও সাংবাদিক ছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী অবস্থানের কারণে একাধিকবার কারাবরণও করেন।

‎নজরুল নাটক ও চলচ্চিত্রেও অবদান রেখেছেন। তিনি ‘ধূপছায়া’ চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন এবং ‘পাতালপুরী’, ‘গোরা’, ‘নন্দিনী’, ‘সাপুড়ে’ প্রভৃতি ছবিতে গীতিকার ও সুরকার হিসেবে যুক্ত ছিলেন। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন।

‎অসুস্থতা ও পরবর্তী জীবন

‎১৯৪২ সালে কাজী নজরুল ইসলাম স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হন, যার ফলে তিনি বাকশক্তি হারান ও সাহিত্যচর্চা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার তাঁকে সপরিবারে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসে এবং তাকে জাতীয় কবি হিসেবে ঘোষণা করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার ডিগ্রি প্রদান করে এবং ১৯৭৬ সালে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

‎মৃত্যু ও স্মৃতির স্থান

‎১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার পিজি হাসপাতালে কাজী নজরুল ইসলাম মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর সমাধি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে অবস্থিত, যা বাঙালির শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এক কেন্দ্ৰস্থল।

‎পুরস্কার ও সম্মাননা

‎নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বহু পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো — ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি, একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক (মৃত্যুর পর প্রাপ্ত) এবং জাতীয় কবির মর্যাদা।

‎উল্লেখ্য, কাজী নজরুল ইসলাম শুধু বিদ্রোহী কবি নন, তিনি মানবতার, ভালোবাসার ও সাম্যের কবি। তাঁর বিদ্রোহ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, তাঁর ভালোবাসা ছিল সকল মানুষের জন্য। বাংলার মানুষের হৃদয়ে তিনি আজও ‘মানুষের কবি’ এবং জাতীয় কবি হিসেবে চিরস্থায়ী অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর সাহিত্য ও সংগীত বাংলার ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় অধ্যায় রচনা করেছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অমলিন দৃষ্টান্ত।। 


মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

গোয়ালন্দতে গণভোট বিষয়ক উদ্বুদ্ধকরণ সভা অনুষ্ঠিত

1

লংগদুতে উপজেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত

2

মরার প্রস্তুতি নিয়ে ভোট কেন্দ্রে যাবেন-ডিসি জাহাঙ্গীর আলম

3

চুয়াডাঙ্গায় সংসদ নির্বাচনে দুটি আসনে ১১ টি মনোনয়নপত্র জমা

4

গ্যাস চাই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হওয়ায় আবারও উত্তপ্ত দনিয়া কলেজ র

5

সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন সদস্যদের অ্যাডভোকেসি বিষয়ক দুই দ

6

মিথ্যা নিকাহনামা ও মিথ্যা গনধর্ষণ মামলায় ন্যায়বিচারের দাবিতে

7

মিরপুরে জামায়াত আমিরের নির্বাচনি জনসভায় মানুষের ঢল

8

নাসিরনগরে ফিরছে সরিষা চাষের ঐতিহ্য

9

দৌলতপুরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীর মুক্তিযোদ্ধা সুনীল চন্দ্র সূ

10

বগুড়া শ্রমিক দলের ১৫নং ওয়ার্ডের ৬১ সদস্য বিশিষ্ট পূনাঙ্গ কমি

11

জামালপুরে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস উদযাপিত

12

শিবগঞ্জে ধানের শীষের বিজয়ের লক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

13

চুনারুঘাটে মাটি ও বালু উত্তোলনে কারাদণ্ড ও জরিমানা

14

মোটরসাইকেল প্রতীক পেলেন মামুন অর রশিদ

15

বাবুগঞ্জে জামিআ কাসেমিয়া ইসলামিয়া মাদরাসার উদ্যোগে ৮ম বার্ষি

16

থাইল্যান্ড–কম্বোডিয়া সীমান্তে সংঘর্ষ থামাতে যুদ্ধবিরতিতে সম্

17

২০০ বছরের পুরনো কোরআন হাতে শপথ নিলেন মামদানি

18

বান্দরবানের লামা উপজেলা প্রশাসন কে বিতর্কিত করার অপচেষ্টার ব

19

মুরাদনগর জাহাপুর ইউনিয়নের স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী সভা অনুষ্ঠ

20