গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই দিতে নির্মাণ করা হয়েছিল আশ্রয়ণের শত শত ঘর। কিন্তু নির্মাণের মাত্র চার বছর না পেরোতেই এসব ঘরের অধিকাংশই এখন পরিত্যক্ত। কোথাও দরজায় ঝুলছে তালা, কোথাও টিনের চাল উড়ে গেছে, নষ্ট হয়ে গেছে জানালা-দরজা। চারপাশে গজিয়ে উঠেছে ঝোপঝাড় ও আগাছা। ফলে দূর থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই—এগুলো একসময় গৃহহীন মানুষের বসবাসের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল।
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বর্ণি ও ডুমুরিয়া ইউনিয়নে প্রায় ৩৫ বিঘা খাসজমিতে ২০২১ সালে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হয় ২৫০টিরও বেশি ঘর। এসব ঘর নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪ কোটি টাকারও বেশি। তবে বর্তমানে প্রায় ১৫০টি ঘরে পরিবার বসবাস করলেও অধিকাংশ ঘরই দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, আশ্রয়ণ প্রকল্পের বেশ কিছু ঘরের চারপাশ আগাছা ও ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে। কোনো কোনো ঘরের টিনের চাল ক্ষতিগ্রস্ত, আবার কোথাও জানালা-দরজা নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক ঘরের দরজায় ঝুলছে তালা। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ঘরগুলো অনেকটা পরিত্যক্ত গোডাউনের মতো দেখাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় স্থান নির্বাচন ও সুবিধাভোগী বাছাইয়ে যথাযথ পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল। ফলে ঘর বরাদ্দ পাওয়ার পরও অনেকেই সেখানে বসবাস করছেন না। নিজের নামে বরাদ্দকৃত ঘর অন্যের কাছে টাকার বিনিময়ে বিক্রয় করে দিচ্ছে বলে জানিয়েছে। আবার কিছু ঘর ভাড়া দিচ্ছে এমনটি বলেছে স্থানীয়রা। এতে একদিকে সরকারি অর্থে নির্মিত ঘরগুলো নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলো আবাসনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ফাঁকা পড়ে থাকা কিছু ঘরে রাতে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। এতে আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিত্যক্ত না রেখে এসব ঘর দ্রুত সংস্কার করে প্রকৃত ভূমিহীন পরিবারকে বরাদ্দ দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বরাদ্দ পাওয়ার পরও যারা ঘরে বসবাস করছেন না, তাদের বিষয়ে তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। টুঙ্গিপাড়া উপজেলা ভূমি অফিসের মো. আলামিন হালদার জানান, যেসব পরিবার বরাদ্দ পাওয়ার পরও আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে বসবাস করছে না, তাদের তালিকা তৈরি করা হবে। যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যারা প্রকল্পের ঘরে বসবাস করছেন না, তাদের বরাদ্দ বাতিল করে প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
গৃহহীন মানুষের জন্য নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারি অর্থে নির্মিত হয়েছিল এসব ঘর। কিন্তু চার বছর পর যদি অধিকাংশ ঘরই তালাবদ্ধ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে, তাহলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে—এমন প্রশ্নই এখন স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত পরিত্যক্ত ঘরগুলোর তালিকা তৈরি করে প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচন, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং ঘরগুলোতে বসবাস নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব কারণে সুবিধাভোগীরা ঘরে থাকছেন না, সেগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এতে সরকারি অর্থের অপচয় রোধের পাশাপাশি আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রকৃত উদ্দেশ্যও বাস্তবায়িত হবে।


