চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে বিষক্রিয়ায় নয় শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় জাহাজের ভেতরে মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি শনাক্ত করেছে বিস্ফোরক অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের প্রাথমিক ধারণা, বিষাক্ত এ গ্যাসের কারণেই শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে। তবে এর বাইরে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আজ শনিবার দুর্ঘটনাকবলিত শিপ ইয়ার্ড পরিদর্শন শেষে এ তথ্য জানিয়েছেন শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান। ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে শিল্প মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং বোর্ডের (বিএসবিআর) পক্ষ থেকে পৃথক ৩টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
শিল্প সচিব বলেন, শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একজন অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে ১১ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৯ সদস্যের তদন্ত কমিটি এবং বিএসবিআর এর পাঁচ সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, দুর্ঘটনার আগে ও পরে কী ঘটেছিল, এর সঙ্গে কারও অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতি ছিল কি না-তা বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখতে কমিটিগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে কারও অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতি পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাস বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে নিরাপদে অপসারণ করা হবে জানিয়ে আব্দুন নাসের খান বলেন, ‘ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনায় যাতে আর কোনো প্রাণহানি না ঘটে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।’এদিকে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পরীক্ষার বরাত দিয়ে শিল্প সচিব জানান, জাহাজটিতে স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় অতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
পরিদর্শনকালে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া, পুলিশ সুপার মাসুদ আলম, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন, বাংলাদেশ শিপব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন, সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল মামুনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক এসএম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি, ঘটনার মূল কারণ হাইড্রোজেন সালফাইডের বিষাক্ততা। আমাদের সমন্বিত কমিটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়েছে, জাহাজ থেকে হাইড্রোজেন সালফাইড অপসারণ করা হবে।’
বিষাক্ত গ্যাস অপসারণের বিষয়ে তিনি বলেন, হাইড্রোজেন সালফাইড সাধারণত পানিতে দ্রবীভূত হয়। এ কারণে সমন্বিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পানি দিয়ে জাহাজের ভেতরের অংশ ধুয়ে গ্যাস অপসারণ করা হবে।
এর আগে শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পুরোনো একটি এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ কাটার সময় জাহাজের বদ্ধ অংশে বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে এসে শ্রমিকদের মৃত্যু হয়।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় ইয়ার্ডে ৩৪ জন শ্রমিক ও কর্মচারী কাজ করছিলেন। একপর্যায়ে জাহাজের ভেতরে থাকা দুই শ্রমিক অচেতন হয়ে পড়েন। তাদের উদ্ধারে অন্য শ্রমিকেরা এগিয়ে গেলে তারাও বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন। পরে একে একে নয়জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়। আরও কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের দুই ভাই মনসুর আহমেদ ও নাসির উদ্দিন রয়েছেন। অন্যরা হলেন সানি দাস, পলাশ দাস, রানা মিয়া, হাবিবুর রহমান, খোকন মিয়া, আব্দুল আলিম সুজন ও ১৭ বছর বয়সি মতিউর রহমান সাজ্জাদ।

